শিশু নির্যাতন
আমরাই ছোট ও বড় অপরাধ করি
আঠারো বছরের নিচে সবাই শিশু। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। আমাদের ভালোবাসা, আমাদের সন্তান। জীবন চলে তাদের ঘিরে।
তবে মাঝে মাঝে এর ব্যতিক্রম ঘটে যায়। নিজের সন্তান ও অন্যের সন্তানের মধ্যে আমরা পার্থক্য করি। আমাদের বাসায় কাজের লোক বা কাজের মেয়ে, আমাদের দোকানের ছোট কর্মচারী শিশুর সঙ্গে অনেক সময় আমরা ভালো ব্যবহার করতে ব্যর্থ হই। দারিদ্র্যের কারণে ছোট শিশু কাজ করতে বাধ্য হয়। যখন সময় খেলার, যখন সময় পড়ার, তখন করতে হয় কাজ। শিশু ভুল করে। দারিদ্র্যে পড়ে ভুল পথে চালিত হয় অনেকে। চুরি করে বা পকেট মারে। আমরা কঠোর হয়ে উঠি। হয়ে উঠি বিচারক। ভালোবাসা ছাড়া বিচার বড় ভয়াবহ জিনিস। আমাদের মধ্যে নানা ধরনের অপরাধী আছে। যারা ছোট-খাটো অপরাধী তারা কিছুটা ধমক-ধামক দিয়ে বা চড়-চাপড় দিয়ে নিজেদের চরিত্রের প্রকাশ ঘটাই। আর যারা বড় অপরাধী, মানুষের ছদ্মবেশে পশু, তারা ভয়াবহ নির্যাতন করি ছোট্ট শিশুদের ওপর। এটা একটা বিশেষ সুযোগ। এই বাচ্চাটি শক্তিতে বা প্রতিপত্তিতে আমার সঙ্গে পারবে না। তাকে তাহলে মারা যাক, করা যাক শারীরিক, মানসিক এমনকি যৌন নির্যাতন।
আমাদের সমাজে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার একটা চল আছে। এই মেয়েশিশুগুলোর অবস্থা কাহিল। এদের মন শিশুর। শরীর বিয়ের জন্য উপযুক্ত নয়। তাদের থেকে বড় স্বামীর ভালোবাসার দাপটে তাদের অবস্থা করুণ। অল্প বয়সে মা হয়ে যায় তারা। তাদের ওপর অনেক ধরনের দায়িত্ব এসে পড়ে। শ্বশুরবাড়ির পরিবেশও থাকে বিরূপ। এই মেয়েগুলোর বয়স সামান্যই। সময় ছিল খেলার, পড়ার, জানার ও প্রস্তুতি নেওয়ার। আর তার বদলে কী হলো। পুরো বিষয়টিকে শিশু নির্যাতন বলে সাব্যস্ত করেন বিজ্ঞজনরা।
পত্রিকাতে প্রায়ই ‘ইভ টিজিং’-এর কথা জানা যায়। অমুকের মেয়ে ইভ টিজিংয়ের কারণে আত্মহত্যা করেছে। ইভ টিজিংয়ের শিকার হয় স্কুলগামী ছাত্রীরা। এটি আসলে মারাত্মক ধরনের শিশু নির্যাতন। নানা নামের কারণে আমরা অনেক সময় আমাদের দেশে শিশু নির্যাতন হয় কি না তা নিয়ে সংশয়ে পড়ে যাই।
আমরা কী না করতে পারি। ধরি, মারি, বেঁধে রাখি, ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় কষ্ট দিই। যৌন নির্যাতন করা, পর্নোগ্রাফি তৈরিতে ব্যবহার করা এমনকি খুন করার কথাও পত্রিকার পাতাতে প্রায়ই দেখা যায়। নির্যাতন করে হত্যা করে সেই হত্যার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রচারের ঘটনা পত্রিকায় এসেছে। কি বীরত্ব! সবাই দেখুক ওনারা কতটা বীর! একদল বড় মানুষ একটা শিশুকে শেষ পর্যন্ত মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন! এ জন্যই বোধ হয় একজন জনপ্রিয় নাট্যকার নতুন গালি চালু করার চেষ্টা করেছিলেন- ‘মানুষের বাচ্চা মানুষ!’ কোনো হিংস্র বাঘও ক্ষুধা না পেলে বা চ্যালেঞ্জ না করলে অন্য বাঘকে মারবে না। বিশেষ করে হার স্বীকার করে নিলে বেশির ভাগ প্রাণীই সমগোত্রের প্রাণীকে আর মারে না। তবে মানুষের ব্যাপারটা আলাদা! আমাদের মতো প্রাণী প্রকৃতিজগতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
পৃথিবীর দেশে দেশে আইন করে শিশু নির্যাতন বন্ধ করা হয়েছে। তবে সব দেশে আইন এক নয়। এ ছাড়া আইন থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে কিছু পরিমাণে শিশু নির্যাতন চলছেই দেশে দেশে। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ওপর পরিসংখ্যান তেমন একটা পাওয়া যায় না। তবে অন্যান্য দেশে এ বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় চাইল্ড প্রোটেক্টিভ সার্ভিসেস এজেন্সি কর্তৃক প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায় এর আগের বছরের কেসগুলোর মধ্যে ৭৮.৩% ছিল শিশুকে অবহেলা করা, ১৭.৬% ছিল শারীরিক নির্যাতন, ৯.২% ছিল যৌন নির্যাতন এবং ৮.১% ছিল মানসিক নির্যাতনের কেস। ভারতের আরএএইচআই নামের দিল্লির একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা যায়, উত্তরদাতাদের ৭৬% শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৪০% পরিবারের সদস্যদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৭৩০ জন শিশু নির্যাতন বা তার সঙ্গে জড়িত বিষয়াদির কারণে মৃত্যুবরণ করেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশে কি শিশু নির্যাতন হয়? এ বিষয়ক গবেষণা নেই বললেই চলে। তবে জাতীয় দৈনিকগুলোর রিপোর্ট, পুলিশ কেস ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে এ ধরনের নির্যাতন হচ্ছে। গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু, বিশেষ করে মেয়েশিশুরা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। দেশে শিশুশ্রমের হার উচ্চ। গবেষণায় শিশুশ্রমিকদের মধ্যে নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের অনেক শিশু পাচার হয়ে বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে এই শিশুদের উটের জকি হিসেবে ব্যবহারের ভয়াবহ প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে এই শিশুরা মারাত্মকভাবে আহত হয় বা মৃত্যুবরণ করে। মানবাধিকারহীনভাবে অনেক দেশে তার গৃহকর্মে নিয়োজিত হয়। বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশে মেয়েশিশুদের যৌনকর্মে নিয়োজিত করার অভিযোগ পত্রপত্রিকায় আমরা দেখি। দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশুর অভিভাবকরা তাদের অবহেলা করছেন। অর্থাৎ তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের নিরাপত্তা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। দেশে বাল্যবিবাহের একটি চল আছে। এর হারও অনেক বেশি। পৃথিবীর অনেক দেশেই বাল্যবিবাহকে যৌন নির্যাতনের একটি ধরন বলে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন কতটা ভয়াবহ তা নির্ধারণে গবেষণা হওয়াটা বিশেষ জরুরি।
শিশু নির্যাতনের ফল ভয়ানক। নির্যাতন ও অবহেলায় শিশুর বিকাশে দারুণ ক্ষতি হয়। তার পৃথিবী এলোমেলো হয়ে যায়।
শিশু আহত হতে পারে, যৌনরোগ ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হতে পারে, পঙ্গু হতে পারে এবং মারাও যেতে পারে। যার বেঁচে যায় তাদের দেহমনে পড়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এই শিশুরা দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা-বেদনায় ভুগে। তাদের অসুখ-বিসুখ বেশি হয়। অনেকের জীবনধারণের উপায়, স্বভাব চরিত্র এমনভাবে বদলে যায় যে সহজেই রোগে আক্রান্ত হয়। তারা নিজেদের প্রতি সচেতন থাকে না, নিজের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে থাকে উদাসীন।
শিশু নির্যাতনের মানসিক ও সামাজিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। শিশুর মন খারাপ থাকে, একটা অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করে। সে আত্মহত্যাপ্রবণ হয় ও নিজের ক্ষতি নিজেই করে, যেমন, নিজেকে কাটে, দেয়ালে মাথা ঠুকে। সে নিজেই নিজেকে দোষী ভাবে, নির্যাতনের ঘটনাটি তার বারবার মনে পড়ে, এমনকি নির্যাতনের দৃশ্যটি তার চোখে এমনভাবে বারবার ভেসে ওঠে যেন ঠিক সেই মুহূর্তেই এটি ঘটছে। তার প্রতিক্রিয়াও তেমনি হয়। সে ঘুমাতে পারে না বা ঘুমালেও বারবার ঘুম ভেঙে যায়। সে দুঃস্বপ্ন দেখে। নির্যাতিত শিশুর ব্যবহার খারাপ হয়ে যেতে পারে। তার রাগ বেড়ে যেতে পারে। তার আচার-আচরণের সঙ্গে বড়দের খাপ খাওয়াতে রীতিমতো সমস্যা হতে পারে। অনেক সময় শিশু যৌন বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। ফলে সে ক্রমান্বয়ে অনেকবার যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে। শিশু ভয় পেতে পারে। তার মধ্যে নানা ধরনের উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পায় না। তার মনোযোগ কমে যায়, স্মৃতিশক্তি, সামাজিক দক্ষতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বিঘ্নিত হয়। শিশু তার যত্ন গ্রহণকারীকে বিশ্বাস করতে পারে না। কারো সঙ্গেই সে ভালোবাসাময় বিশ্বাসের সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। ফলে ভবিষ্যৎ জীবনে কাউকে ভালোবাসতে বা বিবাহের পর স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করতে তাদের সমস্যা হয়। বিশ্বাসের অভাবের কারণে কারো সঙ্গে সাধারণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক করতেও তাদের সমস্যা হয়।
অনেক সময় নির্যাতিত শিশু নিজেই বড় হয়ে নির্যাতনকারী হয়ে উঠতে পারে। যা তার ওপর করা হয়েছে একই ধরনের আচরণ সে নিজের বা অন্যের শিশুদের ওপর প্রয়োগ করতে পারে।
অনেক সময় নির্যাতিত শিশুর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি হয়। যেমন, সে সেক্সুয়াল ডিজফাংশন, মাদকাসক্তি, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, ভীতি, পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিজঅর্ডার, কনভারশন ডিজঅর্ডার, সোমাটাইজেশন ডিজঅর্ডার, বর্ডার লাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার, অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা, বিউলিমিয়া নারভোসা ইত্যাদি মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়।
বিভিন্ন কারণে শিশু নির্যাতন ঘটে। মানুষের মধ্যে প্রজাতিগতভাবেই কিছু পরিমাণে প্রাধান্য বিস্তারের প্রবণতা থাকে। রাগ, হিংসা এগুলো একদম প্রাথমিক আবেগের মধ্যে আছে। ফলে অন্যান্য হিংসাত্মক ঘটনার মতোই শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটে। প্রাণিজগতে নিজের বংশ টিকিয়ে রাখার একটা প্রবণতা দেখা যায়। দেখা যায়, অন্যের বাচ্চাকে হত্যা করে নিজের বাচ্চার টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায় সিংহ বা এ ধরনের হিংস্র প্রাণীরা। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, সৎবাবা-মা কর্তৃক সৎসন্তানকে নির্যাতনের ঘটনাগুলো এই আদিম প্রবৃত্তি দিয়ে অনেকাংশে ব্যাখ্যা করা যায়। পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেকে এই প্রবণতাকে রূপকথার চরিত্র সিন্ডারেলার গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে সিন্ডারেলা সিনড্রোম বলে থাকেন।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব শিশু বাবা-মায়ের পরিকল্পনা ছাড়াই অপরিকল্পিতভাবে জন্মেছে তাদের প্রতি বাবা-মা বেশি নির্যাতন করেন। বড় পরিবার, যেসব পরিবারে অনেক মানুষ একসঙ্গে বাস করে, সেসব পরিবারের শিশুদের নির্যাতিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। যেসব পরিবার বাবা অথবা মা যে কেউ একা চালান (আরেকজন নেই), সে ক্ষেত্রে শিশু নির্যাতনের ঝুঁকি বেশি থাকে। হঠাৎ করে যদি বাবা শিশুর মূল যত্ম গ্রহণকারী হয়ে ওঠেন (যদিও আগে কখনো এই দায়িত্ব পালন করেননি) তবে এই শিশুর নির্যাতিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। যদি বাবা-মা বা যত্ন গ্রহণকারীর মানসিক রোগ থাকে, অনিয়ন্ত্রিত রাগ থাকে, মাদক বা অ্যালকোহলে আসক্তি থাকে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাড়াবাড়ি রকম ঝগড়া থাকে এবং অভিভাবকদের নির্যাতন করার অতীত ইতিহাস থাকে তবে এই পরিবারের শিশুদের নির্যাতিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। অভিভাবকরা যদি চরম ধরনের চিন্তার অধিকারী হন তবে শিশু নির্যাতনের সম্ভাবনা বাড়ে। ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধ মেনে চলতে শিশুকে বাধ্য করার জন্যও অনেক সময় শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
পৃথিবীর দেশে দেশে শিশুকে শৃঙ্খলা শেখানোর জন্য কতটুকু শক্তি প্রয়োগ করা যাবে তার মাত্রার বিষয়ে পার্থক্য আছে। অনেক দেশে শিশুকে শারীরিক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সঠিক পথে চালিত করা সামাজিকভাবে স্বীকৃত। আবার অন্যান্য দেশে এটি শিশু নির্যাতন বলে বিবেচনা করা হয়। কুসংস্কারের বশবর্তী হয়েও মানুষ শিশু নির্যাতন করে। আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করে শিশুকে নির্যাতন করার এমনকি হত্যা করার ঘটনাও ঘটে। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে অল্প বয়সে শিশুদের বিয়ে দেওয়ার, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের বিয়ে দেওয়ার রীতি আছে। এই রীতিকে অনেক দেশে শিশু নির্যাতন বলে বিবেচনা করা হয়। আফ্রিকার কোথাও কোথাও মেয়েশিশুর যৌনাঙ্গে একধরনের অস্ত্রোপচার বা অপারেশন করার বিধান মানা হয়। এটিও অনেক দেশে ভয়ানক ধরনের শারীরিক নির্যাতন বলে মনে করা হয়।
দারিদ্র্যের কারণে অনেক দেশে অভিভাবকরা শিশুদের মৌলিক চাহিদা ঠিকমতো পূরণ করতে পারেন না। শিশু খাবার, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে শিশু অবহেলার শিকার হয়। দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে শিশুশ্রম, শিশুপাচার, শিশুকে যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায় অনেক দেশে। কিছু মানুষের মধ্যে একধরনের ভয়াবহ অসুস্থ প্রবণতা দেখা যায়। তারা শিশুদের সঙ্গে ছাড়া আর কারো সঙ্গে যৌনকর্মে আনন্দ পায় না। এদের পেইডিফেলিয়াক বলে। এরা শিশুদের যৌন নির্যাতন করে। অসুস্থ মিডিয়ার অসুস্থ প্রভাবে (যেমন, পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইটগুলো) মানুষের মধ্যে কিশোরী মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করার একটি প্রবণতার বিকাশ লাভ করছে যা শিশু যৌন নির্যাতন বাড়াবে। পৃথিবীব্যাপী শিশু পর্নোগ্রাফির ব্যাপক বাজার তৈরি হয়েছে। ফলে শিশু যৌন নির্যাতন করে তা পর্নো ওয়েবসাইটগুলোতে দেখানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে শিশু যৌনকর্মীর চাহিদা।
যদি শিশুর মেজাজ-মর্জি বেশি খারাপ থাকে, তার রাগ ও বেয়াড়াপনা স্বভাব থাকে, তার শারীরিক বা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা থাকে, তার কোনো ধরনের মানসিক রোগ থাকে তবে এই শিশুর নির্যাতিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। যদি শিশুর প্রতি বড়দের প্রত্যাশা বেশি থাকে এবং শিশু সেই চাহিদা পূরণে অক্ষম হয় তবে এই শিশুর নির্যাতিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। নির্যাতিত শিশুরা পরবর্তীকালে নিজেদেরই নির্যাতনকারীতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিশু বড়দের দেখে ও অনুকরণ করে শিখে। কাজেই যা তার সঙ্গে করা হয়েছে, তাই সে আবার করবে এতে ততটা অবাক হওয়ার কিছু নেই।
নির্যাতিত শিশুকে প্রথমেই উদ্ধার করতে হবে। যাতে তার ওপর আর নির্যাতন না চলে, যাতে সে তার মৌলিক চাহিদাগুলো পায়, যেমন তাকে খাওয়ার, থাকার ও নিরাপত্তার জন্য কষ্ট করতে না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। তার শারীরিক চিকিৎসা করতে হবে। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজগুলোতে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই সেন্টারগুলোতে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের শারীরিক চিকিৎসা, মানসিক চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, আবাসন সাহায্য করা হয়। একটি সামগ্রিক সহায়তা দেওয়ার আন্তরিক চেষ্টা করা হয়। এ জন্যই এগুলোকে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বলা হয়। এ ছাড়া দেশে যেসব এনজিও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে, তারা তাদের কর্মসূরির অংশ হিসেবে নির্যাতিত শিশুদের সমর্থন দিয়ে থাকেন।
এ ছাড়া যারা শিশু নির্যাতনকারী, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের মানসিক চিকিৎসার আওতায় আনাটা বিশেষ জরুরি। নির্যাতনকারীদের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন করার প্রবণতা দেখা যায়। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বহুসংখ্যক শিশু নির্যাতন করার অভিযোগ প্রায়ই দেখা যায়। এরা থামতে জানে না। তাদের নিরস্ত করা ও তাদের অসুস্থ মনের মধ্যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায় কি না তার চেষ্টা করা দরকার।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধই সর্বোত্তম। সামগ্রিকভাবে এর প্রতিরোধে বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হবে। নিচে এ জন্য কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করছি।
যদি শিশু হঠাৎ করে ভয় পেতে শুরু করে, বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের এড়িয়ে চলে অথবা তাদের প্রতি অতি আগ্রহী হয়ে উঠতে শুরু করে, যদি যৌন বিষয়ে এমন ধরনের তথ্য সে জানে যা তার জানার কথা নয়, যদি তার কাছে এমন সব উপহারসামগ্রী পাওয়া যায় যা তার কাছে থাকার কথা নয়, যদি তার কাছে যতটুকু টাকা থাকার কথা নয় তার থেকে অনেক বেশি টাকা থাকে, যদি সে হঠাৎ করে বিছানা ভিজায়, যদি হঠাৎ অন্য কোনো মানসিক রোগের লক্ষণ তার মধ্যে দেখা যায়, যদি তার শরীরে নানা ধরনের আঘাতের চিহ্ন থাকে যার সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না, যদি সে যৌনরোগে আক্রান্ত হয় তবে অভিভাবকদের বিষয়টি সম্পর্কে সঠিকভাবে তদন্ত করে দেখতে হবে। এ রকম হলে শিশু নির্যাতিত হচ্ছেই এমনটি বলা যাবে না, তবে এমন ঘটার একটি সম্ভাবনা আছে। শিশু যদি অভিযোগ করে যে কেউ তাকে নির্যাতন করছে তবে অভিভাবকদের দায়িত্ব বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা ও খোঁজখবর নেওয়া। যদি এমন কারো বিরুদ্ধে শিশু অভিযোগ করে যেটা বিশ্বাসযোগ্য নয় তবু বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
যদি এমন কোনো কিছু স্কুলের শিক্ষকরা লক্ষ করেন তবে এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের জানানো বিশেষভাবে জরুরি। বাবা-মা শিশুকে ভালো স্পর্শ ও মন্দ স্পর্শের বিষয়ে শিক্ষা দিতে পারেন। শিশুর দেহ নিতান্তই শিশুর এবং তাকে কেউ অস্বস্তিকরভাবে স্পর্শ করলে বা তাকে দিয়ে অস্বস্তিকর কোনো স্পর্শ করাতে গেলে শিশু সেখান থেকে সরে এসে বড়দের বলে দেবে। বাবা-মা কিশোর-কিশোরী সন্তানদের সাধারণ যৌনশিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন। যৌন ক্রিয়া কী জিনিস, কীভাবে সন্তান জন্মায়, যৌনরোগ ও তার লক্ষণ, এগুলো সংক্রমণ ও এর থেকে রক্ষার উপায়, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ে তাদের শেখাতে হবে। এ ধরনের শিক্ষার ফলে শিশু সাবধান হতে পারবে ও বিপদ এড়াতে সক্ষম হবে। যৌন শিক্ষাবিষয়ক অনেক তথ্য ইন্টারনেটে দেওয়া আছে। বাবা-মা আগে নিজেরা এগুলো পড়ে তারপর কতটুকু তথ্য কীভাবে বাচ্চাকে দেবেন তা ঠিক করবেন। প্রয়োজনে তারা মনোচিকিৎসকদের কাছে নিয়ে গেলে তারাও এ ধরনের জ্ঞান কিশোর-কিশোরীদের দিতে পারেন।
কিশোর-কিশোরীদের নৈতিকতা শেখাতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা এ ক্ষেত্রে ভালো একটি উপায় হিসেবে কাজ করে। শিশুকে শেখাতে হবে যাতে সে অন্যদের কাছ থেকে বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়া কোনো খাবার না খায় বা কোনো উপহার বা টাকা পয়সা না নেয়।
শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বের, ভালোবাসার ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। যাতে তারা বাবা-মাকে যে কোনো ধরনের নির্যাতনের কথা বলে দেয়। এমনটা জানতে পারলে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব অভিভাবকদের। সে যাতে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পায়, তার কাপড়-চোপড়ের কষ্ট না থাকে, তার থাকার ব্যবস্থা ভালো হয়। শিশু যেন স্নেহ, ভালোবাসা ও মানসিক সমর্থন পায়, কেউ যাতে তাকে না মারে, ভয় না দেখায় বা অন্য কোনোভাবে বিপন্ন না করে তা দেখার দায়িত্ব অভিভাবকদেরই। শিশু-কিশোরদের কারো সঙ্গে একা ছেড়ে না দিয়ে তাদের দিকে সব সময় একটু নজর রাখবেন, যাতে কোনো সমস্যা না হয়।
নির্যাতনের শিকার শিশু-কিশোরদের কাউন্সেলিংয়ের আওতায় নিয়ে আসতে হবে, যাতে নির্যাতনের প্রভাবে তারা কেউ কেউ নিজেরাই নির্যাতনকারী হয়ে না ওঠে। যারা নির্যাতনকারী, তাদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে এই দূষিত মনোবৃত্তি কমে যায় বা একদম বন্ধ হয়ে যায়।
বাবা-মা ও শিশুর যত্ন গ্রহণকারীদের শিশু প্রতিপালন পদ্ধতির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তারা শিশুর বিকাশ ও বিকাশের বাধা, কী কী আচরণ শিশুর বিকাশে সহায়ক হবে, শিশুর সমস্যামূলক আচরণ কীভাবে দূর করতে শিশুকে সাহায্য করা যায়, পুরস্কার পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুকে ভালো আচরণ শিক্ষা দেওয়া, শিশুর জন্য অনুকরণীয় হয়ে ওঠা, কী ধরনের শৃঙ্খলা শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করবে, ভালো যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন দক্ষতা ইত্যাদি বিষয়ে শেখানো জরুরি। আমাদের দেশে সন্তান প্রতিপালনের ওপর যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। তবে ইন্টারনেট থেকে ‘প্যারেন্টিং’ লিখে সার্চ করলে প্রচুর তথ্য পাওয়া যাবে। এ ছাড়া ‘www.bcps.org.bd’ –এই ওয়েবাসাইটে সার্চ করলে বাংলায় এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে।
বাবা-মায়ের বা অভিভাবকদের কোনো মানসিক অসুখ থাকলে বা তাঁরা মাদকাসক্ত হলে তাঁদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে তা শিশু নির্যাতন কমাতে সহায়ক হবে। বিদেশে শিশু নির্যাতনের কথা সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পুলিশকে অবহিত করলে তারা যথাযথ পদক্ষেপ নেয়। প্রয়োজনে তারা পরিবার থেকে শিশুকে সরিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়ে নেয়। এ ছাড়া নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপও নেয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া এই সেন্টার থেকে প্রয়োজনে শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া হয় ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবহার করে শিশুকে প্রয়োজনে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের সহায়তা ও নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন ফর ভায়োলেন্স এগেইন্সট ওমেন অ্যান্ড চিলড্রেন নামের ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে এমন একটি টেলিফোন নম্বর চালু করা হয়েছে। ১০৯২১- এই নম্বরে ফোন করলে নির্যাতিত শিশুকে উদ্ধারের ও সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ও নির্যাতিত শিশুদের সহায়তা করে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে হিউম্যান রাইটস অরগানাইজেশ বাংলাদেশ এভাবে সার্চ করে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ নম্বর এবং ওয়েবসাইট নম্বর জোগাড় করা যাবে। এ ছাড়া ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স নামের একটি এনজিও শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করছে। তারা নির্যাতিত শিশুদের কাউন্সেলিং সেবাও দিচ্ছে। ০১৭৭৮২৪৯২৭৭- এটি তাদের হটলাইন নম্বর যা ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা এই নম্বরে ফোন দিয়ে জানালে তারা শিশুকে উদ্ধার ও তার সমর্থন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেবে।
দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ও সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট বন্ধ করা, যৌনকর্মী হিসেবে শিশুদের ব্যবহার বন্ধ করা, শিশুপাচার প্রতিরোধ করা, শিশুশ্রম বন্ধ করা ও বাল্যবিবাহ বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সচেতনতা তৈরির জন্য গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে সঙ্গে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারেন। এ ছাড়া নির্যাতন প্রতিরোধে শিশুদের সেল্ফ হেল্প দল গঠন করা যায়। শিশু-কিশোরদের তাদের অধিকার সম্পর্কে এবং এ বিষয়ক আইন-কানুন সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে পরিচালিত হেল্পলাইন নম্বর বিষয়ে, মানবাধিকার নিশ্চিতকল্পে পরিচালিত এনজিও এবং পুলিশের সহায়তা নেওয়ার উপায় সম্পর্কে তাদের জানাতে হবে।
আসুন শপথ নিই যে আমরা কোনোভাবেই কোনো ধরনের শিশু নির্যাতন করব না ও সামর্থ্যমতো এ ধরনের নির্যাতন প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। পারিবারিক, সামাজিক, এনজিও ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়ে শিশু নির্যাতন চিরতরে বন্ধ করতে হবে। আসুন শিশুদের একটা সত্যিকারের ভালো শৈশব নিশ্চিত করি। আমাদের যাতে কেউ- ‘মানুষের বাচ্চা মানুষ বলে’ গালি না দেয় তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।
লেখক : ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

মো. জহির উদ্দিন