নিরাপত্তা
অগ্নিকাণ্ড, অসতর্ক এলাকাবাসী ও কর্তৃপক্ষ
ঈদের এই তৃতীয় দিনে ঢাকার মেরুল বাড্ডায় টিনশেড বস্তিতে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের নগর কতটা অপরিকল্পিত, আর আমাদের সচেতনতার কত অভাব। রামপুরা-বনশ্রী সড়কের মাত্র ১০০ থেকে ৫০ গজের ভেতরে এই দুর্ঘটনা ঘটে। খুব একটা ভালো যোগাযোগব্যবস্থা নেই এ এলাকায়। এলাকাবাসীর মতে, তারা অনেক জায়গায় কথা বলেও এ সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। আর তাই আজও ফায়ার সার্ভিসের আগুন নেভাতে এই ঘিঞ্জি এলাকায় ঢুকতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। প্রধান সড়ক থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করতেই অনেক দেরি হয়েছে। অনেক এলাকাবাসী আগুন নেভাতে সাহায্য করছে। তবে উৎসুক এলাকাবাসীর উৎপাত তো রয়েছেই। এরা শুধু দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিল ফলে আসল কাজ হচ্ছিল বিঘ্নিত। হয় তো তারা বুঝতেও পারছে না একটু দেরি হলে এ আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে তার ঘরেও।
তাই জনগোষ্ঠীকে আগুন লাগার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। এটা সরকারের পক্ষ থেকে করা যেতে পারে। এই প্রশিক্ষণে প্রত্যেক এলাকা থেকে কয়েকটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিকে বাছাই করতে হবে।
তাকে অন্যদের অবহিতকরণের দায়িত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া ঘরবাড়ি নির্মাণ করার আগে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে ঠিকভাবে খতিয়ে দেখা এবং ঘুষ দিয়ে যেকোনো জায়গায় কয়েকতলা বিল্ডিং তুলে ফেলার ব্যবসা বন্ধের দিকেও নজর দেওয়া উচিত।
আমরা সব সময়ই কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে সে ঘটনার প্রতিকার বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা যদি একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখি, অপরিকল্পিতভাবে একটার গায়ে লাগিয়ে আরেক বিল্ডিং, দোতলার ফাউন্ডেশন দিয়ে ছয়তলা বিল্ডিং, ঝিলের ওপর ঘর তৈরি করা, এমনকি বিভিন্ন জায়গায় আমরা দেখতে পাই বৈদ্যুতিক তার ঝুলে আছে, সেটা থেকে অনেক সময় লোকজন ইলেকট্রিক শক খেয়েও মারা যেতে পারে। আবার অনেক সময় আগুন লেগে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে এলাকাবাসী। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে আরো অনেক বেশি সচেতন ও করিৎকর্মা হতে হবে।
মধ্য বাড্ডায় আজকের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা লাইভ নিউজে দেখছি। সেখানে বলা হচ্ছে, ফুচকার দোকান থেকে অথবা ভাই ভাই বোর্ডিয়ের মাঝখানের কোনো একটি রান্নাঘর থেকেই লেগেছে আগুন। আগুন থেমে যাওয়ার পরে আমরা নিশ্চয়ই জানতে পারব কোনটি মূল কারণ। যে কারণেই হোক না কেন, কিছু সতর্কতা, কিছু ব্যবস্থা অবশ্যই অবলম্বন করা উচিত। যেমন : আমাদের প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা দিলেই আমরা যত খুশি তত গ্যাস ব্যবহার করতে পারি ঢাকায়। ঢাকার বাইরের চিত্র তা নয়। ওখানে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। আমার মনে হয় ঢাকা শহরেও বৈদ্যুতিক ইউনিটের মতো গ্যাসের ইউনিট ভিত্তিতে টাকা নেওয়া উচিত। তাহলে গ্যাসের অপব্যবহার রোধের পাশাপাশি মজুদও বাড়ানো সম্ভব। এবং একটিমাত্র ম্যাচের কাঠি বাঁচানোর প্রয়োজনে সারা রাত গ্যাস জ্বালিয়ে কাপড় শুকানো বা শীতে ঘর গরম করা বা অনেক সময় অসতর্কতাবশত গ্যাস জ্বালিয়ে রাখা, যা থেকে অনেক সময়ই ঘরে আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সরকার তো বিভিন্ন প্রকল্পই নিচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। আমি মনে করি এসব মনুষ্যসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সাধারণ জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এতে করে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব। আগুন লাগার পর এর কারণ অনুসন্ধান না করে বরং সে কারণগুলো ঘটতে না দেওয়াই সচেতন নাগরিকদের কর্তব্য হওয়া উচিত। যাই হোক, এ কয়েকদিন ধরেই একনাগাড়ে হয়ে যাওয়া বৃষ্টি ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার কিছুটা সুফল আমরা পাচ্ছি। হয়তো এ আবহাওয়া না থাকলে আরো অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ত এ লেলিহান শিখা। খুব সৌভাগ্যক্রমে ঈদের বন্ধে অনেকেই ঢাকার বাইরে থাকায় এখন পর্যন্ত হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও কারণ অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরপরেই হয়তো আগুন লাগার নেপথ্যের কাহিনীটি পরিষ্কার হবে আমাদের কাছে।
লেখক : প্রভাষক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

কুন্তলা চৌধুরী