উৎসব
শরৎ ছুঁয়ে যাক ঈদের আনন্দ আকাশ!
এবার ঋতুর রানি শরৎ নিয়ে এসেছে ঈদুল আজহা উৎসবের বর্ণিল আমেজ। পরিষ্কার নীল আকাশে সাদা মেঘের আলপনা। বৃক্ষশাখে সবুজ পত্ররাজি, বিলে লাল-সাদা শাপলা শালুক, ক্ষেতে ক্ষেতে বেড়ে ওঠা ধানের সবুজ পত্রপল্লব আর নদীর ধারে কাশফুলের দুলুনি এবারের ঈদকে দিয়েছে স্বচ্ছতা ও শুভ্রতা। সঙ্গে এক পশলা বৃষ্টি থাকুক বিশুদ্ধতার প্রতীক হয়ে! অরুণ আলোর অঞ্জলিতে বিনিময় হোক শারদীয় ঈদ শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক!
নবাবী আমলে ঢাকায় ঢোল পিটিয়ে ঈদের আগমনী জানান দেওয়া হতো। হতো ঈদের মিছিল, চকবাজারের মেলা, রেসকোর্সের ঘোড়দৌড়, সঙ্গে মোগলাই খাবার। আজ না হয় সফেদ প্রকৃতিই ঈদকে স্বাগত জানাল। পাখপাখালিরাই করল আনন্দ মিছিল।
তবে আজকের কোরবানির দ্যোতনা নিশ্চিতার্থেই ভিন্নতর। বন্যার ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের লাখো বানভাসি মানুষ। অন্ন, বাসস্থান আর ওষুধের সংকটে থাকা এসব মানুষের ঈদটা হয়তো আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারছে না তেমনভাবে। শরৎ তাদের মনে দোলা দিয়ে যাচ্ছে না। তবে আমাদের সদিচ্ছা কিন্তু পারে বন্যার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। কোরবানির রেওয়াজ মেনে এ-বাড়ি ও-বাড়ি গরু দেখতে যাওয়ার আনন্দটা এবার ভাগ করতে পারেন অসহায় মানুষের সঙ্গেই।
যাদের সামর্থ্য আছে তারা গাড়ি নিয়ে চলে যেতে পারেন, কোনো এক ডুবে যাওয়া চড়ে। যেখানে মানুষের একবেলা অন্ন জোগাতেই ত্রাহি অবস্থা, ঘর ভেসে গেছে বানের জলে, তাদের আবার ঈদ কিসের? সেইখানে আপনার কোরবানির পশুর খানিকটা আমিষ যদি তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে পারেন আপনার ঈদ হতে পারে ব্যতিক্রম ও অনন্য। আর সেই সব মানুষ পেতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা। তাদের আনন্দ আকাশেও খেলা করতে পারে সাদা মেঘ, ছুঁয়ে যেতে পারে সফেদ শরৎ।
আমাদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আজকের দিনটিকে বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, আল্লাহর নিকট দিবসসমূহের মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হলো কোরবানির দিন, তারপর পরবর্তী তিন দিন। পরিচ্ছন্ন হয়ে, সুন্দর পোশাক পরিধান করে সুগন্ধি মেখে ঈদের মাঠে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঈদের নামাজ শেষে যার যার সাধ্যমতো মহান প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে হবে পশু। তবে এই কোরবানির উদ্দেশ্য কেবলমাত্র পশু জবাই নয়। ইব্রাহিমের ত্যাগের মহিমা অর্জন। বিষয়টি সুস্পষ্ট করে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘শহীদী ঈদ’ কবিতায় বুঝিয়ে বলেছেন :
মনের পশুরে কর জবাই,
পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।
কসাই-এর আবার কোরবানি!
আমাদের মনের পশুরে জবাই করে যদি মানবিকতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে দুর্বিপাকে পড়া মানুষের দিকে ফিরে তাকাতে পারি, তবেই হতে পারে আজকের কোরবানির আসল সার্থকতা। নইলে আমাদের ত্যাগটা কসাইয়ের নিত্যদিনের গরু জবাইয়ের সঙ্গে কোনো পার্থক্য নিরূপণ করবে না!
আজকের দিনটা হোক না সুখ ভাগাভাগির দিন। ঢাকার নবাবদের কিংবদন্তিতুল্য রসনাবিলাসের ২৪ পদ খাবার না হোক, সামর্থ্যহীনের পাতে একপদ গোমাংসের বিশেষ খাবার পরিবেশনেই হোকনা আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ আয়োজন।
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে নানা রিচুয়াল এখনো প্রচলিত আছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বিয়ের ধুম পড়ে। আর ঐতিহ্য অনুযায়ী বরের বাড়ি থেকে কনের বাড়ি কিংবা কনের বাড়ি থেকে বরের বাড়িতে উপযুক্ত গরু বিনিময়টা একটি খানদানি রেওয়াজ। গরুর সৌন্দর্য বা মূল্যমানের ওপর নির্ভর করে কনে বা বরপক্ষের ভাবমূর্তি। গরু না দিলে বিয়ের আনন্দ হয় না। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কনের বাবা বাজারের সেরা গরুটিই তাঁর মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পাঠাতে চান মেয়ের মুখ উজ্জ্বল করতে।
তবে এই প্রথাটাও নিশ্চয় সামর্থ্যবানদের জন্য। এখনো গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষের ঈদ বড়ই বিবর্ণ ও মলিন। নিজেদের তিনবেলার অন্ন জোগাতেই যাদের দিন পার হয়, তাদের আসলে অর্থ সংকুলান করতে না পারার কারণেই আলাদা করে ঈদ উদযাপনের ফুরসত থাকে না।
কিন্তু শহুরে যে বাবুটি গ্রামে ঈদ করতে যান, তিনি তার স্বর্গকেই যেন হাতের মুঠোয় পান। তার ওপর গ্রামে যদি মানুষটির কোনো অবদান থাকে তবে গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বণিতা শহুরে বড় চাকুরেকে পারলে মাথায় করে রাখে। আজ ঈদের দিনে গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে সেই সব মানুষের দিকেও নজর ফেরান যারা আপনাকে মাথায় করে রাখে। গায়ে নির্মল হাওয়া লাগিয়ে, হাসনাহেনার গন্ধ মেখে, পাখিদের কিচিরমিচির শুনতে শুনতে, শিশুদের সঙ্গে মিশে গিয়ে কোনো এক চাষি বা মৎস্যজীবী জেলে ভাইয়ের সুখদুঃখের গল্প আত্মস্থ করেই কাটুক আপনার আজকের ঈদের শ্রেষ্ঠ দিন। আর মন ও মননে বাজুক প্রেমের কবি নজরুলের সেই ‘শহীদী ঈদ’ কবিতার অমোঘ পঙক্তিমালা :
শুধু আপনারে বাঁচায় যে,
মুসলিম নহে ভণ্ড সে!
ইসলাম বলে বাঁচ সবাই!
দাও কোরবানি জান ও মাল,
বেহেশত তোমার কর হালাল।
স্বার্থপরের বেহেশত নাই।
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন

ফারদিন ফেরদৌস