সু চির ভাষণ
মুখরোচক বুলি বনাম বাস্তবতা
রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল। মিয়ানমারে নিরো ছিল না, ছিলেন বিপরীত ভাবমূর্তির সু চি। তিনি শান্তিতে নোবেলজয়ী, ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ হিসেবে বিশ্বে সুপরিচিত, মিয়ানমারে জান্তা সরকারের একসময়কার ‘ত্রাস’, বছরের পর বছর বরণ করেছেন গৃহবন্দিত্ব। কিন্তু মিয়ানমারের কার্যত নেতা ও রাষ্ট্রীয় পরামর্শক সেই সু চির সরকারের সেনাবাহিনী, অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তাদের সহযোগী বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, নারী-শিশু-বৃদ্ধদের ঠেলে দিচ্ছে অগ্নিগর্ভে, ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। এমন বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে যখন নিন্দার ঝড়, ‘গণতন্ত্রের প্রতীক’ সু চি তখন মুখে এঁটেছিলেন কুলুপ। কিন্তু কেন? সেই প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখেই রাখাইনে সর্বশেষ সহিংসতা শুরুর তিন সপ্তাহ পর বিশ্ব গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন মিয়ানমার রাষ্ট্রের পরামর্শক। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেন ভাষণ; শোনান সহিংসতা বন্ধের ইচ্ছার কথা, উন্নয়নের আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি।
গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের ৩০টি পুলিশ চৌকি ও একটি সেনাক্যাম্পে হামলা হয়। এর দায় স্বীকার করে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ বা আরসা)। ওই দিনই রাখাইনের সহিংসতা বন্ধে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশগুলো প্রকাশ করে মিয়ানমার সরকার।
সেই হামলার খেসারত হিসেবে নিরস্ত্র রোহিঙ্গা মুসলিম ও হিন্দুদের ওপর মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চলা স্মরণকালের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক দমন-পীড়ন এখনো চলছে। আর এর বলি হয়ে এরই মধ্যে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছে চার লাখ ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। ঘরবাড়ি ছেড়ে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে রোদ আর বৃষ্টির অবিরাম ধকল সামলে কোনোরকমে বেঁচে আছে তারা।
ওপারে সেই মানুষদের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় ত্রাণকর্তা সু চি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হওয়া প্রায় ৩০ মিনিটের একটি ভাষণ দেন। সেই ভাষণে রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক বহু বিষয় উঠে এসেছে। এর বেশির ভাগই আলোচনার দাবি রাখে।
১. ভাষণের শুরুতে সু চি বলেন, ৭০ বছর ধরে চলা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পর মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আসে, যার যাত্রা শুরু ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর। এর পর তিনি বলেন, মিয়ানমার একটি জটিল দেশ। এই জটিলতার কারণ, লোকজন দ্রুততম সময়ে সব সমস্যার সমাধান চায়। ২০১৫ সালে ক্ষমতায় আসা তাঁদের সরকারের ১৮ মাসও হয়নি (এই বছরের শেষে হবে)। জনপ্রত্যাশা পূরণে এই সময় খুবই অল্প। কিন্তু এর পরও তাঁরা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এর পর সু চি বলেন, বিশ্বের নজর এখন রাখাইন রাজ্যে। তাঁর সরকার রাখাইন রাজ্যে আন্তর্জাতিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে শঙ্কিত নয়। তাঁরা রাখাইনে শান্তিপূর্ণ সমাধান চান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সু চির বক্তব্যের আগপর্যন্ত সেই ‘নিবিড় পর্যবেক্ষণের’ জন্য ঘটনাস্থলে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি বা সাংবাদিকদের প্রবেশের ঘটনা বিরল।
একটি সংঘাতের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যাওয়া একটি অপরিহার্য শর্ত। অথচ এক মাস ধরে চলা সংঘাতে রাখাইনের প্রকৃত অবস্থা জানতে রাষ্ট্রীয় অনুমতি ছাড়া একজন সাংবাদিক প্রবেশ করেছেন এমন কোনো খবরও পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেদক জনাথন হেড জানান, রাখাইনের মংডু, বুথিডং ও রাথেডংয়ে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলিম থাকেন এবং সে অঞ্চলগুলোতে যেতে সরকারের অনুমতি লাগে। তাঁরা ১৮ জন স্থানীয় ও বিদেশি সাংবাদিক যেতে পেরেছিলেন সরকারি আয়োজনে। সেখানেও কেবল সরকার যেসব জায়গায় চেয়েছে, সেগুলোতে যেতে পেরেছেন। আবার যেসব লোকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে, তাঁদের সঙ্গেই কথা বলতে পেরেছেন তাঁরা। এমনকি তাঁরা নিজেরা আলাদাভাবে অবস্থার পর্যবেক্ষণ করতে পারেননি। সন্ধ্যা ৬টার পর ওই সব এলাকায় জারি করা ছিল কারফিউ।
২. মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় পরামর্শক জানান, জাতিসংঘে তাঁর বক্তব্যের ১৮ দিন পর ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় সশস্ত্র মুসলিম গোষ্ঠীগুলো (যদিও সশস্ত্র গোষ্ঠী নাকি গ্রামবাসী, তা নিয়ে বিতর্ক আছে)। এর পর ১১ অক্টোবর ও ১২ নভেম্বর আবার হামলা চালানো হয় এবং এই সংঘর্ষের ফলে প্রাণহানি, আহত, গ্রাম পোড়ানো এবং লোকজন বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর পর অনেক ‘মুসলিম’ বাংলাদেশে চলে যায় এবং তাঁর সরকার মুসলিম ও রাখাইনদের (বৌদ্ধ) মধ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছে।
এই বক্তব্যে সু চি একবারের জন্যও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি, তিনি বলেছেন মুসলিম। আবার তিনি প্রাণহানির কথা বলেছেন, অতি নরম ভাষায়। অথচ এর পরে সেনাবাহিনীর সহিংসতার কথা একবারও মুখে আনেননি। কেন সেই হামলা হলো, তার কোনো কারণও দেখাননি, সেনাদের অকথ্য নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলেননি কোনো কথা।
যুক্তরাজ্যে সক্রিয় রোহিঙ্গাদের সংগঠন বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের (বিআরওইউকে) তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময় নির্যাতিত রোহিঙ্গা গ্রামবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর ৯ অক্টোবর হামলা চালায়। এতে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজনকে হত্যা করে এবং অস্ত্র লুট করে। সেই দিন (৯ অক্টোবর) থেকে ২০ নভেম্বরের মধ্যে ৪২৮ রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হন, ধর্ষণের শিকার হন ১৯২ রোহিঙ্গা নারী, গ্রেপ্তার করা হয় ৪৪০ জনকে। এই সময়কালে নিখোঁজ হন ১২০ জন, পেটানো ও শারীরিক নির্যাতন করা হয় ১৬০ জনকে, এক হাজার ৭৮০টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে বাস্তুচ্যুত হয় কমপক্ষে ৩৫ হাজার মানুষ। অথচ সু চি বলছেন, ৯ অক্টোবরের হামলার পর তাঁর সরকার শান্তি ফেরাতে সম্ভাব্য প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছে।
৩. মিয়ানমারের নেতা বলেন, রাখাইনের পরিস্থিতি ঠিক রাখতে তাঁর সরকার কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অথচ তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি সামলানো যায়নি। ৯ অক্টোবরের হামলার পর কয়েক মাস ধরে শান্তি ছিল রাখাইনে। এর পর আবার রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির নেতৃত্বে হামলা হয়েছে, যারা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬ নম্বর ধারার ৫ নম্বর উপধারা অনুযায়ী সন্ত্রাসী। তিনি বলেন, সরকার কারো ওপর দোষারোপ করতে বা দায় এড়াতে চায় না এবং ‘সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ও ‘বেআইনি সহিংসতা’র নিন্দা জানায় এবং রাজ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন ফেরাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে সংযত হয়ে, আইন মেনে অভিযান চালাতে বলা হয়েছে এবং বেসামরিক লোকজনের প্রাণহানি না করে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, সু চির সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ৪০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হবে নাফ নদে ডুবে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১০৫ জনের লাশ হওয়া।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভাষ্য হলো, এক থেকে তিন হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশের কক্সবাজারে এক রোহিঙ্গা শরণার্থী এনটিভি অনলাইনের প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, তিনি রাখাইনের জঙ্গলগুলোতে লাশের পর লাশ দেখেছেন।
৪. সু চি কারোর ওপর দোষারোপ না করার কথা বললেও তাঁর দপ্তর সেনাদের হামলার খবরই স্বীকার করতে চায়নি। রাখাইনে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর ৬ নভেম্বর তাঁর সঙ্গে কথা বলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। এরপর প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমে প্রকাশিত সু চির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হলো, ‘বরফের স্তূপের মতো ভুয়া তথ্য’ ছড়ানো হচ্ছে। অথচ সেই সময়ে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র দুই সপ্তাহে এক লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে বাংলাদেশে গেছে, যেটা কয়েক দিন আগেই চার লাখ ছাড়িয়েছে। আর তাঁর সরকার যে মানবাধিকার লঙ্ঘন না করার নির্দেশ দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে, তার নমুনা দেখা গেছে গত সপ্তাহগুলোতে। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রায় প্রত্যেকে ধর্ষণ ও হত্যা দেখার কথা বলেছেন। একজন নারী কক্সবাজারে সরেজমিনে রোহিঙ্গাদের প্রতিবেদন করা এনটিভি অনলাইনের প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা নারীদের কোনো জীবন নেই, সেনাসদস্যদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না কেউই। সেনারা সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের স্তন কেটে নেয়, এর পর বাচ্চার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। মিয়ানমারের সেনা ও দোসরদের হাতে এমন নির্মমতার শত শত চিত্র উঠে আসছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
এনটিভি অনলাইনে ‘রোহিঙ্গাদের কান্না’ নামে একটি বিভাগ করা হয়েছে। সেখানে পাওয়া যাবে লোমহর্ষক নির্যাতনের বহু চিত্র। অর্থাৎ, সু চির কথামতো মিয়ানমারের সেনারা কোনোভাবেই মানবাধিকার মেনে কাজ করেননি। তিনি একতরফাভাবে আরসার ওপর দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু দিনের পর দিন মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা খাদ্য, শিক্ষাসহ মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো থেকে যে বঞ্চিত, তা নিয়ে তাঁর কোনো অবস্থান পরিষ্কার করেননি।
৫. ভাষণে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংকটকে ‘হালকা’ করে দেখাতে সু চি বলেছেন, রাখাইনে হিন্দুসহ অন্য জাতিগোষ্ঠীও সহিংসতার শিকার হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের বেশির ভাগ অংশ এ বিষয়ে সচেতন নয়। অথচ রাখাইনে শতাধিক হিন্দুকে হত্যার খবর গুরুত্বের সঙ্গে ছাপিয়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম।
৬. অং সান সু চি জোর দাবি নিয়ে বলেছেন, ৫ সেপ্টেম্বরের পর কোনো সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়নি এবং সেনাবাহিনীর কোনো শুদ্ধি অভিযান চলেনি। অথচ বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেদক জনাথন হেড এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, ৭ সেপ্টেম্বর সরকারের আয়োজনে রাখাইনের আলেল থান কিয়াউ এলাকায় যাওয়া সফরে তিনি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ পেয়েছেন এবং কিছু দূরত্বে একটি গ্রামে চারটি স্থান নিয়ে ধোঁয়া উড়তে দেখেছেন। প্রমাণ হিসেবে ধোঁয়ার ছবিও তুলে সংবাদে যুক্ত করেছেন। আরো আগ্রহ উদ্দীপক বিষয় হলো, একই দিনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের গ্রাম গ ডু থার ইয়ায় গিয়ে তিনি দেখেছেন, রাখাইন বৌদ্ধ পুরুষরা পুলিশ ব্যারাকের কাছেই ঘরে আগুন দিয়েছে। সেই ছবিও প্রতিবেদনে সংযুক্ত করেছেন তিনি।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার এই ছবিটি তুলেছেন বিবিসির প্রতিবেদক
৭. সু চির ভাষ্য, বহু মুসলিম (রোহিঙ্গা বলেননি এবং হিন্দুও উচ্চারণ করেননি) পালিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে এবং তাঁরা চান, এর কারণ অনুসন্ধান করতে। যারা পালিয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে চান এবং যারা থেকেছে, তাদের সঙ্গেও কথা বলতে চান তাঁরা। তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যের বহু লোক সেই পালিয়ে যাওয়ার মিছিলে যোগ দেননি। মুসলিমদের ৫০টি গ্রাম অক্ষত আছে, তারা আগের মতোই বসবাস করছেন। এমনকি রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা এখনো মিয়ানমার আছে, তারা সেখানে কী কারণে আছে, এত দুর্যোগেও তারা কেন সেখানে আছে, তা কূটনীতিকদের সরাসরি দেখানোর প্রস্তাব দেন তিনি। কিন্তু তাঁর এ বক্তব্যের ঘোর বিরোধিতা করেছেন বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থী ও রোহিঙ্গা নেতারা।
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ নূর বিবিসিকে বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কারণেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। কিন্তু সু চি এই সত্যকে গোপন করেছেন।
‘সম্পূর্ণ মিথ্যা বলেছেন সু চি। অত্যাচার না করলে, নির্যাতন না করলে, গুলি না করলে, কাটাছেঁড়া না করলে মানুষ কেন আসবে এখানে? জীবনেও আসত না। মিয়ানমারে মুসলিম ছিল ১২ লাখ । এর মধ্যে সাত লাখই তো এখানে এসে পড়েছে। মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে পারলে কি এক দেশ থেকে আরেক দেশে পালিয়ে আসে? সু চি সামরিক বাহিনীর লোকজনকে ভয় পান। সে জন্যই এভাবে বলেছেন।’
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে থাকা আরকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বিবিসিকে বলেন, 'সু চি তাঁর বক্তব্যে যা বলেছেন, তা মোটেও সঠিক নয়। তাঁর না জানার মতো কোনো কারণ নেই। সময়ে সময়ে রোহিঙ্গারা তাঁকে সব জানিয়েছে, কী হচ্ছে আর না হচ্ছে। আর সু চি জেনেও না জানার মতো করছেন। শি ইজ এ প্রিটেন্ডার। একই সময়ে তিনি মিথ্যা কথা বলেছেন। আমরা তো খালি হয়ে গেছি, সেটা আপনারা দেখছেন তো। ওখানে আছে কী এখন?’
আবদুল হাফিজ নামের এক রোহিঙ্গা বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে জানান, নিজেদের কারণে রোহিঙ্গারা গ্রামছাড়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘এটা যদি সত্য হয়, তবে সু চির উচিত ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রামগুলোতে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া।’ যদি রোহিঙ্গারা ভুল প্রমাণিত হয়, তবে বিশ্ব যদি সিদ্ধান্ত নেয় সাগরে ঠেলে দিয়ে আমাদের মেরে ফেলার, তা আমরা মেনে নেব।’

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের গ্রাম থেকে ধোঁয়া ওড়ার আরেকটি ছবি। এটিও প্রকাশ করেছেন একই প্রতিবেদক
৮. দীর্ঘ এ বক্তব্যে রাখাইনে নানা ধরনের উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়েছেন সু চি। তিনি বলেন, রাখাইনে তাঁর সরকার আর্থসামাজিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখেছে। প্রমাণ হিসেবে তিনি ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত একটি পরিকল্পনার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, স্থানীয় জনগণের জন্য শত শত নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সে সুযোগ স্থানীয় কারা বা কোন জনগোষ্ঠীর লোক পাচ্ছে, তা পরিষ্কার করেননি সু চি।
অন্যদিকে রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের চিত্র হলো, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মধ্য দিয়ে তাঁদের পড়ালেখা, কাজ, বিয়ে, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তা অব্যাহত আছে।
৯. সু চি তাঁর বক্তব্যে নতুন মহাসড়ক নির্মাণের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, রাখাইনে বসবাসরত লোকজন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবায় কোনো বৈষম্য ছাড়াই সুযোগ পাচ্ছে। কোনো বৈষম্য ছাড়াই উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পান মুসলিম শিক্ষার্থীরাও (কোন মুসলিম, তা উল্লেখ করেননি)। ৩০০ স্কুলের মানোন্নয়ন ঘটানো হয়েছে, শিক্ষার্থীরা কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা পাচ্ছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিদিন শত শত প্রতিবেদক চষে বেড়াচ্ছেন কক্সবাজারে ঠাসাঠাসি করা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে। সেখানে উচ্চশিক্ষিত দূরের কথা, স্বল্পশিক্ষিত মানুষও খুব কম।
সরেজমিনে কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে যাওয়া এনটিভি অনলাইনের প্রতিবেদকরা হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষিত পেয়েছেন। তাঁদের একজন তাফরিদা, যিনি একসময় জাতিসংঘের কর্মী ছিলেন। এখন শরণার্থী হয়ে আছেন বাংলাদেশে। তিনি এনটিভি অনলাইনকে জানান, ২০১২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে তিনি বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিতে (ডব্লিউএফপি) যোগ দেন। কারণ, মিয়ানমারের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও সেখানে তাঁদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের কোনো অধিকার ছিল না। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, একদিন মিয়ানমার সরকার তাঁদের নাগরিকত্ব দেবে এবং তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবেন। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধরা তাঁর সেই স্বপ্ন ধ্বংস করে দেয়।
১০. মিয়ানমার সরকারের একাধিক দায়িত্বে থাকা সু চির ভাষ্য, তাঁর সরকারের যাচাই-বাছাই (ভেরিফিকেশন) প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চাননি অনেক মুসলিম নেতা। কিন্তু ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব বাতিল করা নিয়ে তাঁর কোনো মন্তব্য ছিল না, তাঁদের ফের নাগরিক করা হবে কি না, তা নিয়েও কোনো বক্তব্য নেই তাঁর।
১১. বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে মিয়ানমার সরকার জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন সু চি। প্রমাণ হিসেবে জানুয়ারি ও জুলাইয়ে দেশটির শীর্ষ কর্তাদের বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি দেখান তিনি। কিন্তু আগস্টে সহিংসতা শুরুর পর থেকে মিয়ানমার সরকারের একের পর এক বৈরী আচরণের খবর বেরিয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে ১৭ বার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এ নিয়ে বিবৃতি পাঠিয়ে এর কঠোর সমালোচনা করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
১২. শরণার্থীদের ফেরত আনার আহ্বান জানানো হচ্ছে উল্লেখ করে সু চি বলেন, তাঁরা যেকোনো সময় যাচাই-বাছাই (ভেরিফিকেশন) প্রক্রিয়া শুরু করতে প্রস্তুত। সেটার ভিত্তি হবে ১৯৯৩ সালের বিধি। তিনি পূর্ণ নিরাপত্তা দেবেন। কিন্তু বাংলাদেশে থাকা অধিকাংশ শরণার্থী জানিয়েছেন, মিয়ানমারে গেলে তাঁর প্রাণে বাঁচবেন না। তাঁরা কষ্ট করে হলেও বাংলাদেশেই থাকতে চান।
১৩. সু চি বলেন, রোহিঙ্গাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া এবং পালিয়ে যাওয়া নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ আছে। তাঁরা সব শুনবেন এবং এগুলো কতটা সত্য, তা খতিয়ে দেখবেন। কিন্তু তাঁর খতিয়ে দেখার আগেই চার লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে চলে গেছে। গ্রাম পোড়ানোর ছবিতে সয়লাব হয়ে গেছে ইন্টারনেট। খতিয়ে দেখার পর রাখাইনে আদৌ কতজন রোহিঙ্গা পাওয়া যায়, তা নিয়েই এখন সন্দেহ আছে বিভিন্ন মহলের।
১৪. বক্তব্যের শেষের দিকে সু চি বলেন, তাঁরা যুদ্ধ চান না, শান্তি ও সম্প্রীতি চান। তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি দেহের একটি অঙ্গের অসুস্থতার কথা না ভেবে, পুরো দেহটি নিয়ে ভাবতে হবে। তিনি এমন একটি দেশ চান, যেখানে সবাই শান্তি ও সমৃদ্ধিতে বসবাস করতে পারে।
মিয়ানমারের নেত্রী বলেন, সরকার স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতি করেছে। আলোচনা ও সংলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে, হৃদয় প্রশস্ত করতে হবে। কথা বা হাতিয়ার দিয়ে কাউকে আক্রমণ করা যাবে না। বিদ্বেষ ও ঘৃণা সহিংসতা ছড়ায়। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কিন্তু ট্রেডমার্ক পোশাকে, অনেকটা ব্রিটিশদের মতো ইংরেজিতে, স্বরের পরিমিত ওঠানামায় সু চির এ বক্তব্যকে গ্রহণ করেনি আন্তর্জাতিক বহু মানবাধিকার সংগঠন বা দায়িত্বশীল মহল। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক জেমস গোমেজ বিবিসিকে বলেন, ‘অং সান সু চি তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে আবার দেখিয়েছেন যে তিনি ও তাঁর সরকার রাখাইন রাজ্যের ভয়াবহ পরিস্থিতির বিষয়ে বালিতে তাঁদের মাথা গুঁজে রেখেছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, ‘৫ সেপ্টেম্বরের পর থেকে যদি রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযান বন্ধ হয়ে যাওয়ার বক্তব্য সত্য হয়, তাহলে গত দুই সপ্তাহে আমরা সেখানে যেসব গ্রাম পুড়ে যেতে যেতে দেখেছি, সেগুলোতে কারা আগুন দিচ্ছে?’
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল ইউনিসেফের কর্মকর্তা পল এডওয়ার্ডস সু চির বক্তব্যে সংশয় প্রকাশ করে বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের কেউই আসলে জানি না, রাখাইনে কী ঘটছে। কারণ, আমরা সেখানে যেতে পারছি না।’
উল্লিখিত সব আলোচনা ও প্রশ্নে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, সু চি যা বলছেন, তাতে আগ্রহী হওয়ার মতো অনেক বিষয় আছে, আছে নতুনত্ব। কিন্তু পার্লামেন্টের দুই কক্ষে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও প্রায় দেড় বছরে তাঁর ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রাণ বাঁচাতে কার্যত উদ্যোগ নিতে পারেনি। কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন, তাঁর দেশের গণতন্ত্র এখনো অপরিণত। অর্থাৎ, তিনি বোঝাতে চাইছেন, জান্তারা এখনো কলকাঠি নাড়ে। কিন্তু জান্তারা কলকাঠি নাড়ে নাকি সু চি তাদের নাড়তে দেন বা জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে সহ্য করেন,তা পরিষ্কার নয়।
এমন বাস্তবতায় মিয়ানমারের কার্যত নেতার এই বক্তব্য বাংলাদেশের ‘ঠাঁই নাই’ ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমের কাছে শুধুই ঈশপের গল্প নাকি দূরতম বাস্তব—তা জানতে হয়তো বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না।
লেখক : সাংবাদিক।

আজহারুল ইসলাম