অভিমত
সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে আমাদের মনোবৈকল্য
অধিকাংশ আধুনিক বাঙালি একটা জায়গায় বেশ ব্যতিক্রম। বিতর্ক ছাড়া তাঁদের কোনো কার্যই সিদ্ধিলাভ হয় না। সোজাসাপ্টা, ছন্দবদ্ধ বা সুশৃঙ্খল কর্ম বলে যেন বা কিছুই তাঁদের থাকতে নেই। এই যেমন এবারের সুন্দরী প্রতিযোগিতা। মেধা, মনন ও যোগ্যতা দিয়ে বিশ্বসভায় ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ প্রতিযোগিতায় নাম লেখাবে আমার দেশের শ্রেষ্ঠ নারীটি। সেখানেও গোল বাঁধানো হয়েছে। ‘লাভেলো মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ নামে প্রতিযোগিতা নিয়ে আয়োজকরা এমন একটি লেজেগোবরে অবস্থা সৃষ্টি করেছেন যে প্রতিযোগীদের অনেককেই এখন কেঁদেকেটে বুক ভাসাতে হচ্ছে। আর এই সুযোগে ফেসবুকার বাঙালি যাচ্ছেতাইভাবে নারীর প্রতি বিষোদ্গার করে চলেছে। অথচ নিন্দা যদি পেতেই হয়, তার পুরোটা প্রাপ্য অন্তর শোবিজ ও অমিকন এন্টারটেইনমেন্ট নামে অদক্ষ ও অদূরদর্শী আয়োজকদের। যা তাঁরা পারবেন না, তা করে জলঘোলা করে বাংলাদেশের সম্মানহানি তাঁরা করতে যান কেন?
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রাচীন গ্রিসে প্রথম সুন্দরী প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। নতুন শহর ব্যাসিলেসের উদ্বোধন উপলক্ষে করিন্থের শাসক কিপসেলাস ওই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। শুরুর সে প্রতিযোগিতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। কারণ, সবার চক্ষু ছানাবড়া করে দিয়ে সে প্রতিযোগিতায় সেরা সুন্দরী নির্বাচিত করা হয়েছিল ওই শাসকের স্ত্রীকেই।
আর একালে আমাদের এখানে বিচারকদের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথম তিনজনের মধ্যেও নাম না থাকা জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলকে আয়োজকরা বিজয়ী ঘোষণা করেন, যার কি না প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের একজন প্রতিযোগী হিসেবে আগামী নভেম্বরে চীনে অনুষ্ঠিতব্য ৬৭তম ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীকালে বিজয়ী এভ্রিলের গোপন করা কিছুদিনের বিবাহিত জীবনের ছবি প্রকাশ হয়ে পড়লে মিস ওয়ার্ল্ডের শর্ত ভঙ্গ করার অভিযোগে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে প্রথম রানারআপ জেসিকা ইসলামকে বিজয়ী ঘোষণা করার কথা জানানো হয়। তারও আগে গ্র্যান্ড ফিনালের উপস্থাপক শিনা চৌহান তৃতীয় স্থানে থাকা জান্নাতুন সুমাইয়া হিমির নাম ঘোষণা করেন। এই পুরো অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয় টিভি স্টেশন এনটিভি বিশ্বব্যাপী সরাসরি সম্প্রচার করে। ফলাও করে দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় এভ্রিলের গুণকীর্তনও গাওয়া হয়েছে। এখন যা কিছু প্রকাশ বা প্রচার হয়ে গেল, তা কি আর ফেরত আনা যাবে? সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী এদিক-সেদিক করে যা লাভ করার, তা করবেন অন্তর শোবিজের চেয়ারম্যান স্বপন চৌধুরী। গণমাধ্যমের সময় অপচয় করা কিংবা প্রতিযোগীদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলবার অধিকার কি তাঁর থাকা উচিত?
অন্তর শোবিজের উচিত ছিল জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি বাতিল করে দিয়ে নতুনভাবে বিচারকাজ সম্পন্ন করা। কিন্তু তিনি তো বিচারকদের পাত্তা দেওয়ার মানুষ নন। তিনি ব্যবসা বোঝেন, নারীর সম্মানহানিতে তাঁর কিচ্ছু আসে-যায় না।
আমরা গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জেনেছি, ‘লাভেলো মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফিনালের বিচারক ছিলেন বিবি রাসেল, জুয়েল আইচ, শম্পা রেজা, চঞ্চল মাহমুদ, রুবাবা দৌলা মতিন ও সোনিয়া কবির। চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় ওঠা বিতর্ক প্রসঙ্গে তাঁরা মিডিয়াকে জানিয়েছেন, এটা খুব অন্যায় হয়েছে। আমাদের সবার কাছে যে প্রথম হয়েছে, তাঁকে প্রথম করা হয়নি। যাকে প্রথম করা হয়েছে, সে আমাদের প্রথম তিনজনের তালিকায়ও ছিল না। যেহেতু এটা একটা আন্তর্জাতিক ইভেন্ট, তাই আমরা এমন একজন প্রতিযোগীকে বাছাই করতে চেয়েছি, যে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পারবে। আমরা একবাক্যে জেসিকা ইসলামকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নির্বাচিত করি। শুক্রবার রাতে যা ঘটল, তা আমাদের জীবনে খুব খারাপ একটা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল। এত বড় একটা অন্যায় এভাবে হবে, ভাবতেও পারিনি। তাঁরা বলেন, আয়োজকরা যদি নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, তাহলে তো বিচারক হিসেবে আমাদের রাখার প্রয়োজন ছিল না। আমাদের জন্য এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নাম ঘোষণার ওই মুহূর্তে এত মানুষের সামনে আমরা আয়োজকদের অপমান করতে চাইনি। এখন মনে হচ্ছে, তখন আমাদের এই কাজ করা উচিত ছিল।
খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগছে যে প্রতিযোগী বিচারকদের দৃষ্টিতে প্রথম তিনজনের তালিকাতেই ছিলেন না, তাঁকে কোন স্বার্থ বা দুরভিসন্ধিতে আয়োজকরা প্রথম বানিয়ে দিলেন? আর এখন বিয়ের কথা ওঠায় তাঁকে কেনই বা যেমন খুশি হেনস্তা করা হচ্ছে? তাহলে আমরা কি ধরে নেব, এ দেশের নারীদের নিয়ে পুরুষ অধিকর্তারা যা ইচ্ছা তাই করার ক্ষমতা রাখেন? কোনো আইনই তাঁদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারে না?
আমাদের বক্তব্য খুবই সাদাসিধে। যেহেতু নারীর অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করবার দায় কোনো আয়োজক বহন করে না। যেহেতু নারীকে মানুষ বলে গণ্য করার কোনো চিন্তা-চেতনা এখানকার শোবিজ সওদাগররা লালন করেন না, সেহেতু তাদের উচিত এসব কর্মযজ্ঞ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখা। আমরা জানি, বিশ্বব্যাপী আমেরিকাভিত্তিক ‘মিস ইউনিভার্স’ কিংবা যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমের যাঁরা বিশ্ব সুন্দরীর খেতাব অর্জন করেন, তাঁরা ভবিষ্যৎ জীবনে ভারতীয় সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা ঐশ্বরিয়া রাইয়ের মতো নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দারুণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। কিন্তু তা হাতেগোনা দু-চারজন। বাকিরা কালের গর্ভে হারিয়ে যান।
এসব প্রতিযোগিতায় যখন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ধুরন্ধর ব্যবসায়ীরা অর্থলগ্নি করেন, তখনই বিতর্ক ওঠে। ট্যালেন্ট নয়, প্রতিযোগিতায় বিজয়ের মানদণ্ড হয়ে ওঠে একান্ত ব্যক্তিগত যোগাযোগ। এবং এই অর্থেই বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা কোনো নীতিবাগিশ বা মানবতাবাদীর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এসব প্রতিযোগিতা অত্যন্ত হাস্যকরভাবে মেয়েদের কাছে তাদের ‘ভার্জিনিটি’ দাবি করে। পুরুষদের সামনে নিজেদের সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে ধরতে বাধ্য হন মেয়েরা। প্রতিযোগিতার বিচারকাজও যেসব মাপকাঠিতে নির্ণয় করা, তা নারীর জন্য বড় অবমাননাকর। উচ্চতা, ওজন, কোমর, বক্ষ আর অধোদেশের ভিত্তিতে মার্কিং করেন বিচারকরা। যাঁরা এমন পদ্ধতিগুলো নারী সৌন্দর্যের মানদণ্ড করেছেন এবং যেসব নারী বিচারক এসব প্রতিযোগিতার বিচারকাজে নাম লেখান, তাঁদের ব্যক্তিত্বের রুচি নিয়ে আমাদের প্রশ্ন থাকবেই।
বিজয়ী এভ্রিলের ক্ষেত্রে অবশ্য ‘পিনোন্নত পয়োধর’ জয়ের মানদণ্ড বলে বিবেচিত হচ্ছে না। আয়োজকদের জানতে হচ্ছে তাঁর কুমারিত্বের খবর। কৌমার্য না থাকলে তিনি বিশ্ব সুন্দরী হতে পারবেন না!
চট্টগ্রামের একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি উচ্চতার এভ্রিলের জীবনসংগ্রাম, রুচিশীলতা, সৌন্দর্য সচেতনতার কোনো গ্রহণযোগ্যতাই এখন আর নেই। এসএসসি পরীক্ষার আগে রানা নামের এক ছেলের সঙ্গে কয়েক দিনের সংসার জীবনকেই করা হলো তাঁর অযোগ্যতার তুলাদণ্ড। তাহলে এখন নতুন বিজয়ীর বিশুদ্ধতা নিরূপণে কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন মিস্টার পুরুষ আয়োজক?
সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে মানুষের এমনতর মনোবৈকল্য আর দেখতে চাই না। কী হয় নারীকে পণ্য বানানোর এসব সুন্দরী প্রতিযোগিতা না থাকলে? প্রিয় নারী, কী হয় এসব প্রতিযোগিতায় নিজেদের নাম না লেখালে? নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ বাঁচবে তাঁর কর্ম, নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতায়। নারী বা পুরুষের শারীরিক গঠন কেন বিচার্য হবে সুন্দরের ক্ষেত্রে? বিষয়গুলো নারীদের ভাবতে হবে, ভাবতে হবে পুরুষদেরও।
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।

ফারদিন ফেরদৌস