উচ্চ মাধ্যমিক ফলাফল
শিরোনামের সঙ্গে এ কেমন ছবি?
পরাবাস্তববাদী চলচ্চিত্র বা চিত্রকলা নিয়ে যাঁদের ধারণা আছে, তাঁরা জানেন যে সেখানে প্রায়ই ঘটনাকে প্রকাশ করা হয় ভিন্নার্থক কোনো প্রতীক বা দৃশ্য দিয়ে। ধরুন কোনো একটি মৃত্যুসংবাদ, তার প্রকাশ হলো হয়তো রেলগাড়ি চেইন টেনে বন্ধ হয়ে যাওয়া। কিংবা ভিন্ন কিছু। পরিচালক বা চিত্রকর অনুযায়ী এই প্রকাশের ঢং ভিন্ন হয়। একই সঙ্গে, পুরো বিষয়টি অবশ্যই পরাবাস্তবে সীমাবদ্ধ- বাস্তব প্রেক্ষাপটে নয়। তবে, আজকের দিনে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকার দিকে যদি নজর বুলিয়ে থাকেন, তাহলে বুঝতে পারবেন পরাবাস্তবকেও হার মানাতে পারে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও ছবি।
বহুবিধ কারণেই (কিংবা অকারণে?) এ বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে বিপর্যয় ঘটেছে। পাসের হার কমে গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় নেমেছে, কমেছে জিপিএ ৫ পাওয়ার হার। গেল বছরেই জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ হাজার, সেখান থেকে এক ধাক্কায় সংখ্যাটি নেমে এসেছে প্রায় ৩৫ হাজারে। সরকারি বা বেসরকারি পক্ষ, শিক্ষার্থী-অভিভাবক, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান এর কারণ হিসেবে নিজস্ব অবস্থান থেকে বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। এগুলো নিয়ে তর্কে যাওয়ার কোনো অবকাশ না থাকুক, পত্রিকার শিরোনাম আর কয়েক কলামজুড়ে ছাপা ছবি দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই।
শিরোনামে যেখানে তুলে ধরা হয়েছে ফলাফল বিপর্যয় বা পাসের হার কমে আসার কথা, সেখানে ছবিতে দেখানো হয়েছে একটি নির্দিষ্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা তুমুল উল্লাসে লম্ফঝম্ফ করছে। শিরোনাম এবং ছবির মধ্যে এই উদ্ভট এবং আকাশ-পাতাল পার্থক্য কেন, তা বোধগম্য হয় না কোনোমতেই। দু-একটি, স্পষ্ট করে বললে একটি ইংরেজি দৈনিক ছাড়া বাকি প্রায় সব পত্রিকাতেই একই কাণ্ড। সন্দেহ জাগে, ঘটনা এবং বহিঃপ্রকাশের মাঝে এই বিশাল ফারাকের কারণ কি অতিরিক্ত পরাবাস্তববাদী চলচ্চিত্র-দর্শন? সেই সন্দেহটাও আসলে ধোপে টেকে না, এমন বিচিত্র পরিবেশনা তো আসলে কস্মিনকালে বাঘা বাঘা কোনো পরাবাস্তববাদী চলচ্চিত্রকারও করেননি বোধ করি!
ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীরা আনন্দ প্রকাশ করবেন, এটি স্বাভাবিক। আনন্দ উদযাপনের ভঙ্গিমাতেও এখন পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার্থীরা সেলফি তুলছে মহানন্দে, হিন্দি আইটেম নম্বর ‘নাগিন নাগিন’ ভঙ্গিমায় হাত তুলে লাফাচ্ছে-এসব একটু নতুন। সেটা তাদের ব্যাপার, এই বিষয় নিয়ে জনসংস্কৃতিবিষয়ক লম্বাচওড়া ব্যাখ্যা অন্য কোনো সময়ের জন্য তোলা থাকতে পারে। আমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বহু বছর ধরে ফলাফল-সংক্রান্ত বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রমোট করা হয়। এর পেছনে যে ফলাফল নয় বরং ‘কাটতি’ সংক্রান্ত উদ্দেশ্যই মুখ্য- তা সামান্য বোধবুদ্ধিসম্পন্ন লোকও বুঝবে। সেই ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এবার কিছু নতুন ঢংঙেরও প্রমোট করা হয়েছে। সাধুবাদ জানানো ছাড়া উপায় কি, সার্কুলেশনের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে না!
এইচএসসির ফলাফলে এই বিপর্যয় দুঃখজনক। যারা কৃতকার্য হয়েছে, শিগগিরই তাদের অনেকেরই এই আনন্দের সময়টুকু পেরিয়ে এক দুঃস্বপ্নের মতো সময় আসতে যাচ্ছে, কারণ তাদের স্থান সংকুলানের জন্য যথেষ্ট আসন নেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে। কঠিন এক পরীক্ষার পর এক হিসেবে, সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হবেন তাঁরা, যেখানে ‘সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ তত্ত্বের জয়জয়কার। তাদের জন্য শুভকামনা রইল।
তেমনি, সংবাদ বনাম প্রকাশিত ছবির এই বিচিত্র বিপর্যয়ও গ্রহণযোগ্য নয়। যে সংবাদটি দুঃখজনক, সেই সংবাদের ছবি এমন উল্লাসে ‘জর্জরিত’ হওয়াটা আমাদের কল্পনাশক্তির দৈন্যেরই বহিঃপ্রকাশ। উচ্চ মাধ্যমিকে মন্দ ফলাফলে বাঘা বাঘা দৈনিক পত্রিকায় শিরোনামের সাপেক্ষে কেমন ছবি উপস্থাপন করা উচিত, তা সংশ্লিষ্ট সবারই মোটামুটি বোঝার কথা। এ জন্য স্টুয়ার্ট হলের রিপ্রিজেন্টেশন থিওরি পড়বার দরকার নেই, ‘কমন সেন্স’ কাজ করলেই যথেষ্ট। তবে বাণিজ্যের চাপে যদি ‘কমন সেন্স’ বিকল হয়ে যায়, তখন একজন গণমাধ্যমকর্মী বা সাধারণ মানুষ হিসেবে কেবল দীর্ঘনিশ্বাস ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না।
লেখক : সাংবাদিক

সামি আল মেহেদী