প্রতিক্রিয়া
যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা
দেশে এখন ক্ষমতা ও বিভক্তির রাজনীতি সর্বত্র। দিন যত যাচ্ছে, ভারসাম্যহীন এ চর্চা আশঙ্কাজনক হারে তত বেড়েই চলেছে। এর বিষবাষ্প আজ নিরহংকার-নির্লোভ দেশপ্রেমিকদের পর্যন্ত গ্রাস করে চলেছে। এর কুফল দেশের মানুষ অনেক আগে থেকেই দেখতে শুরু করেছে। এ দেশের মাটি ও জনগণ যাদের কাছে ঋণী, এমন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান না জানানোর মধ্য দিয়ে যে বিভক্তি রেখা অঙ্কন করা হয়েছে, তা দেশপ্রেমিকদের হতাশ করেছে। যাদের দ্বারা এ বিভক্তি কমানোর কথা, দুঃখজনক হলেও সত্য; তারাই বারবার এটাকে উসকে দিচ্ছে। ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য নিত্যনতুন আইন তৈরি করা হচ্ছে। দেশের জনগণের চেয়ে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা, আরাম-আয়েশই সর্বদা প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ক্রমে বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি চলছে দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের হেয় করার নানা পাঁয়তারা। একজন যখন ক্ষমতায়, তখন অন্যের সব কাজ অবৈধ বলে গণ্য করা, নতুন আইন তৈরি করা—এটাই যেন জাতীয় রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে বলতে হয়, যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা।
সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া রাষ্ট্রপতিদের অবসরভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা বন্ধ করে নতুন একটি আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে মহাজোট সরকার। গত সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন, ২০১৫-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী ১৯৭৯ সালে তৈরি ‘প্রেসিডেন্টস পেনশন অর্ডিন্যান্স’-এ শুধু ছিল, যদি কোনো রাষ্ট্রপতি নৈতিক স্খলন বা অন্য কোনো অপরাধে আদালতে দণ্ডিত হন, তাহলে অবসরভাতা পাবেন না। কিন্তু নতুন এ আইনের বিধানে বলা হয়েছে, অসাংবিধানিক পন্থায়, অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বা হয়েছিলেন মর্মে আদালত কর্তৃক ঘোষণা হলে তিনি অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন না।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই খসড়া আইনে পরিণত হলে অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, লে. জেনারেল এইচ এম এরশাদ, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ ও আবু সা’দত মো. সায়েম রাষ্ট্রপতি পদের জন্য কোনো অবসরকালীন আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কেউ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে তিনিও এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হবেন না। তবে স্বাধীনতার পর থেকে যেসব বৈধ রাষ্ট্রপতি এ সুবিধা নেননি, তাঁরা বা তাঁদের উত্তরাধিকারীরা এ সুবিধা পাবেন। এর আগে হাইকোর্ট ২০১০ সালে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া এক রায়ে খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েম, শহীদ জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদকে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী বলে বর্ণনা করে।
মূলত বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর অবসরভাতা বা অন্যান্য সুবিধার বিষয়টি নির্ধারিত হয় ১৯৭৯ সালের ‘প্রেসিডেন্টস পেনশন অর্ডিন্যান্স’ অনুযায়ী। ১৯৮৮ সালে অধ্যাদেশটি সংশোধন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার কখনো অবসরভাতা পায়নি, কারণ ওই আইন হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। তবে জাতীয় সংসদে নতুন এ আইন পাস হলে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারীরা এ অবসরভাতা পাবেন।
মন্ত্রিসভায় ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন, ২০১৫’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, ‘অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে জিয়াউর রহমান ও এরশাদ উচ্চ আদালতের রায়ে প্রমাণিত ব্যক্তি। তাই তাঁরা অবসর-সংক্রান্ত কোনো সুবিধা পাবেন না।’
তবে এটা সত্য যে, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের কেউ পছন্দ করে না। আওয়ামী লীগও বরাবর এমনটা দাবি করে। কিন্তু তাঁরা অপছন্দ করলেও নিজেদের স্বার্থে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সাবেক সামরিক স্বৈরশাসকের সঙ্গেই জোট বেঁধেছেন; দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের মর্যাদা। এইচ এম এরশাদ অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণে স্বভাবতই অবসরভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার কথা। কিন্তু মহাজোট সরকারের অন্যতম শরিক হয়ে রাজনীতির মাঠ দাবড়ে বেড়াচ্ছেন তিনি এবং তাঁর দল। তাহলে এটা আবার কেমন রাজনীতি? স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, সরকার বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে এ ধরনের আইনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এই উদ্দেশ্য যদি হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলের নেতাকে হেয় করা, তাহলে তা জাতির জন্য কোনো ভালো উদ্যোগ বয়ে আনবে না; বরং দেশের বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক অবস্থায় যাঁরা দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান প্রদানের মাধ্যমেই দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আমরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকে লক্ষ করতে পারি। ভারতের সদ্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত হলেও তাঁকে যথাযথ সম্মান জানাতে এতটুকু কার্পণ্য করেনি বিজেপি সরকার। কিন্তু বাংলাদেশে যাঁরা অস্বাভাবিক অবস্থায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কাঁধে নেয়, তাঁদের এভাবে অসম্মানিত করার চেষ্টা কতটা যুক্তিযুক্ত?
অন্যদিকে, আরেকটি বিষয় আমাদের কৌতূহলী করে তোলে। সেটা হলো, আওয়ামী সরকার এরশাদকে আদালতের মাধ্যমে অবৈধ ঘোষণা করে দূরে ঠেলে দিয়েছে, আবার তারই সঙ্গে বসে দেশ পরিচালনা করছে। তাহলে এই অবসরভাতা বন্ধ ও চালু কার স্বার্থে? মনে হচ্ছে, বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা দলকে হেয় করার উদ্দেশ্যেই এমন আইন করা হচ্ছে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, কোনো প্রজন্মই ক্ষতবিক্ষত, ধ্বংস ও অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীকে পছন্দ করে না। পছন্দ করে না তাদের সঙ্গে রাজনীতি করতে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা দেখে বলতে ইচ্ছা করে, সত্যিই বিচিত্র এই দেশ!
লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বেলাল হোসাইন রাহাত