শিশুশিক্ষা
আনন্দদায়ক হোক স্কুলে যাওয়া
স্কুলের বাচ্চারা কতটুকু ওজনের ব্যাগ বহন করতে পারবে, সে ব্যাপারে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
১১ আগস্ট জারি করা ওই রুলে প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়ুয়া বাচ্চাদের মোট ওজনের ১০ ভাগের এক ভাগের বেশি ভারী ব্যাগকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রি-প্রাইমারির শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো ব্যাগ বহন না করতে রিট জারি করেছেন আদালত।
দুই সপ্তাহের মধ্যে আইনসচিব, শিক্ষাসচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে ওই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের জেরে ৯ আগস্ট আইনজীবী এস এম মাসুদ হোসেন দোলন, মো. জিয়াউল হক ও আনোয়ারুল করিম এ রিট আবেদন করেন।
যার আদেশ প্রকাশ ঘটে ১১ তারিখে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে।
রিটকারী আইনজীবীরা ভারতের মহারাষ্ট্রের উদাহরণ সামনে নিয়ে এসেছেন। সেখানকার সরকার শিশুদের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী স্কুলব্যাগ বহন না করার একটি নির্দেশনা জারি করেছে।
আমাদের দেশে ছয় বছর বয়সে একটি বাচ্চাকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করানোর সাধারণ নিয়ম। সে হিসেবে একটি বাচ্চার গড় ওজন ১০-১২ কেজির বেশি হওয়ার কথা নয়। আবার স্থানভেদে, অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত তারতম্যের কারণে এ ওজনের হ্রাস-বৃদ্ধিও ঘটে থাকে। তবে আমাদের গ্রামাঞ্চলে এর হ্রাস প্রবণতাই বেশি। কারণ, সেখানে পুষ্টিহীনতা একটি সাধারণ সমস্যা। এ ছাড়া অন্যান্য রোগ-ব্যাধি তো তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করছেই। আবার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিশালী ঘরের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ঘটে তার উল্টো। তারা পুষ্টিগুণে সক্রিয় থাকলেও একটি শিশুর খোলা হাওয়ায় বিকাশের পথটা থাকে অনেকটা বন্ধ। তারা উচ্চতার তুলনায় ভারী হয়ে যায়।
তাহলে কীভাবে নির্ধারণ হবে বাচ্চাদের ব্যাগের ওজন? কারণ, একটি ১০ কেজি ওজনের বাচ্চা পাচ্ছে এক কেজি ওজনের ভার বহনের স্বীকৃতি। আর তারই সমবয়সী একটি বাচ্চা ভারী হওয়ার কারণে সে স্বীকৃতি পাচ্ছে তার চেয়ে ভারী বহনের বৈধতা। তাহলে কীভাবে তাদের ভার বহনের সমাধান করা যেতে পারে?
একটাই সমাধান—এমন একটি নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে স্পষ্ট করা হবে বাচ্চাদের প্রয়োজনীয় বইয়ের সংখ্যা, সে বইগুলো কোন পাঠ্যক্রমের হবে, তা-ও নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। পাশাপাশি বাচ্চাদের পানির বোতল ও টিফিন বক্সের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
অর্থনৈতিক সচ্ছল পরিবারের বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিতে তাদের পিতামাতা বা কাজের লোক সাহায্য করে থাকে। কিন্তু খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তানদের একাই স্কুলে যেতে হয় সেই প্রথম শ্রেণি থেকে। তাহলে তাদের সঙ্গে বাড়তি একটি ছাতাও যোগ হচ্ছে।
এবার অঙ্ক কষা যাক। একটি ব্যাগের ওজন যদি হয় গড়ে ৩০০ গ্রাম, প্রথম শ্রেণিতে জাতীয় পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বইসংখ্যা তিনটি। সঙ্গে খাতা। আর টিফিন বাক্স, পানির বোতল ও ছাতা মিলে মোট ওজন কত হয়?
অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন নিজস্ব পাঠ্যপদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। সেখানে স্বভাবতই থাকে অনেক বইয়ের সমাহার। আর সৃজনশীল পদ্ধতির কারণে আর্ট করার পেনসিলসহ অন্যান্য সামগ্রী তো থাকছেই।
পাশাপাশি চলছে নিরবচ্ছিন্ন পাঠদান পদ্ধতি। একটি শিশু সকাল ৮টায় স্কুলে গেলে দুপুরের দিকে তার স্কুল ছুটি হয়। দুপুরের খাবার তাড়াতাড়ি শেষ করেই তাকে আবার বসতে হয় প্রাইভেট বা কোচিংয়ে। অনেক পরিবারের সন্তান স্কুল ছুটির পরপরই বাসায় না ফিরে এই পড়া পড়ে থাকে। ফলে তাকে বাসা থেকে বেরোনোর সময় সব বইখাতা একই সঙ্গে নিয়ে বের হতে হয়।
বাচ্চারা স্কুলে যাবে হেসেখেলে। উন্নত বিশ্বে বাচ্চারা স্কুলে যেতে না পারলে কান্নাকাটি করে। কারণ, তাদের আনন্দের সময় কাটে স্কুলে। সেখানে তারা হেসেখেলে সময় কাটায়। তাদের পাঠ্যপদ্ধতি নিশ্চয় আমাদের চেয়ে সহজ নয়। তবে এটা সঠিক যে, তাদের পাঠ্যবিন্যাস পদ্ধতি আমাদের চেয়ে বেশ ভিন্ন।
চায়নার একটি শিশুকে শিশুকালেই প্রায় ১০ হাজারের ওপর ভাষাগত ‘সেট’ মুখস্থ করতে হয়। কারণ যেহেতু তাদের একটি ধ্বনিরই রয়েছে একাধিক অর্থ। যেমন—শুধু ‘ঈ’ ধ্বনির রয়েছে ২৮৩টি অর্থ। তাহলে চায়না শিশুরা কি পিছিয়ে আছে? মোটেই নয়। কারণ তাদের এমনভাবে শেখানো হয় যে তারা পড়তে গেলে ভয় পায় না। তারা আনন্দ পায়। তারা খেলতে খেলতে শেখে।
আমরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলেও দেখব শিশুদের খেলতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নবীজি শিশুদের সাত বছর পর্যন্ত তাদের মতো করে চলতে-খেলতে দিতে বলেছেন। কারণ, এতে তাদের বিকাশ ঘটে।
আমাদের বাচ্চাদের স্কুলের কথা মনে পড়লেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। তারা স্কুলের সেই কাঁধ বাঁকানো ব্যাগটাকেই বেশি ভয় পায়।
তাই শিশুদের ভয় কাটানোর জন্য চাই ভয় তাড়ানোর ব্যবস্থা। এতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ঘটবে। তারা আনন্দের সঙ্গে পড়ালেখা করবে। এ জন্য চাই জাতীয় শিশু নীতিমালা। ব্যাগের ওজন সম্পর্কিত নীতিমালা। এর জন্য প্রয়োজন সব প্রতিষ্ঠানে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্যক্রম প্রক্রিয়া। এর ব্যত্যয় কেউ করলেও তা যেন বেশ হেরফের না হয়, সেদিকেও সরকারকেই নজর দিতে হবে।
এ ব্যাপারে কথা হয়েছিল প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত জাতীয় পাঠ্যক্রম প্রণয়ন কমিটির সাবেক সদস্য দিদার মাহমুদের সঙ্গে। তিনি দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, একটি প্রথম শ্রেণির শিশুর বৃদ্ধির জন্য শুধু একটি বাংলা বই, একটি অঙ্ক বই ও একটি ইংরেজি বই যথেষ্ট। শুধু শুধু বাচ্চাদের কাঁধে ভারী ব্যাগ চাপিয়ে দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। এতে বাচ্চাদের বিকাশ ব্যাহত হয়।’
লেখক : সাংবাদিক

সানাউল্লাহ মাহী