আন্তর্জাতিক
আই অ্যাম আয়লান, অ্যান্ড আই অ্যাম নট আ রিফিউজি
ঈজিয়ান সাগরের পাশে বদরাম সৈকতে উল্টো হয়ে পড়ে থাকা শিশুর নিথর দেহ এখন বিশ্বের সব সীমানা প্রাচীর, সাগর-মহাসাগর, কাঁটাতার পেরিয়ে দূরের আকাশে মিলিয়ে যাওয়া ছোট্ট একটি তারা। আয়লান পৃথিবীর সব নিয়ম-কানুন, ভিসা, অভিবাসন, পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব, ধর্ম ছাপিয়ে এখন একটি মুক্ত পাখির নাম। আয়লানের আকাশে জাতিসংঘ নেই, সীমান্ত নেই, কাঁটাতার নেই, সৈন্য নেই, অস্ত্র নেই- এমনকি নেই ক্ষুধার যন্ত্রণাও।
কয়েকদিন ধরে সামাজিক বিভিন্ন মাধ্যমে ‘নিহত’ আয়লানের পড়ে থাকা ছবিটি বেশ চোখে পড়ছে। আয়লানের নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের (আমি একে হত্যাকাণ্ডই বলি) পর ছবি দেখে আমার বিন্দু পরিমাণ আক্ষেপ হয়নি। বরং মনে মনে শান্তি পেয়েছি, অন্ততপক্ষে একটি শিশু মুক্তি পেয়েছে। মুক্ত বিহঙ্গের মতো আকাশে উড়ে বেড়াতে পারবে। নিজের ইচ্ছে মতো ওড়াওড়ি করতে পারবে। তাই আয়লানের মৃত্যু আমাকে শঙ্কার চেয়ে, উদ্বেগের চেয়ে, বিষাদের চেয়ে মুক্তির আনন্দ দিয়েছে বেশি। আয়লানের উপুড় হয়ে আকাশকে ঢেকে দেওয়ার দৃশ্য দেখে বিমূঢ় হইনি, বরং পৃথিবীর নিয়ম-কানুন আর ক্ষমতার রেষারেষিতে আয়লান লজ্জা পেয়ে পিঠ প্রদর্শন করেছে, এই ভেবে আমি খুশি হয়েছি। আমি কি ভুল বলছি? সৈকতে লাল টি-শার্ট, নীল হাফ প্যান্ট ও জুতা পরিহিত আয়লানের উপুড় হয়ে পড়ে থাকার দৃশ্য অন্য কারো কাছে অন্য কোনো মানে থাকলেও আমার কাছে এর মানে হলো- আয়লান পৃথিবীর জঘন্যতায়, বর্বরতায়, প্রতিহিংসায় আর নৃশংসতায় লজ্জা পেয়েছে, ঘৃণায় মুখ লুকিয়েছে সৈকতের বালুচরে।
আয়লানকে নিয়ে আমি কোনো আহাজারি করতে চাই না। আয়লানকে নিয়ে আমি শোকগ্রস্ত হতে চাই না। আয়লানকে নিয়ে আমি কোনো প্রলাপ বকতে চাই না। আমি খুশি কারণ, আয়লান বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে এই পৃথিবীর অভিবাসন সিস্টেমকে। যারা আয়লানের মৃত্যুকে মানবতার বিপর্যয় বলছেন- আমি তাঁদের সাথে একমত না। তাহলে তথাকথিত আরব বসন্তে সিরিয়া, লিবিয়া, তিউনিশিয়া, আর কয়েক দশক ধরে আফ্রিকায় লাখ লাখ শিশুর বিপন্ন জীবন, নির্যাতন, যুদ্ধের শিকার হওয়াসহ শিশু নিহত হওয়ায় মানবতার পতন হয়নি? এত দিন কোথায় ছিল আমাদের এই হুজুগে চেতনা? কোথায় ছিল আমাদের দরদি এই মানবতাবাদী চরিত্র? এর আগে কখনো কি শিশু মরেনি?
গত বছরের শেষের দিকে ইউনিসেফ জানিয়েছিল, বিশ্বের দুই কোটি ৩০ লাখ শিশু যুদ্ধ ও সহিংসতার শিকার। সিরিয়া ও ইরাকে আইএসআইএল গোষ্ঠীর উত্থানের পর সিরিয়ায় ৩৭ লাখ ও ইরাকে ২৭ লাখ শিশু সহিংসতা আর উগ্রতার শিকার হয়েছে। সিরিয়ার শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ শিশু প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া গত বছরে ইসরায়েলের ৫০ দিনের হামলায় গাজার ৫৪ হাজার শিশু গৃহহারা এবং ৫৩৮ শিশু নিহত হয়েছে।
আর মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের প্রায় ১০ হাজার শিশুকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে সশস্ত্র নানা গ্রুপ। তারা ৪৩০ শিশুকে হত্যা করেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ সুদানে পাঁচ বছরের কম বয়সী দুই লাখ ৩৫ হাজার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। আর যুদ্ধের ফলে উদ্বাস্তু হয়েছে সাত লাখ ৫০ হাজার শিশু।
এই হলো পরিসংখ্যান! এক আয়লানের মৃত্যুতে তাই মরা কান্না কাঁদার চেয়ে আমি স্বস্তি পাই এই বলে, অন্তত একটি শিশু মুক্তি পেল পিশাচের খড়গ থেকে। বিশ্বে লাখ লাখ শিশু এখনো উদ্বাস্তু, ভুগছে পুষ্টিহীনতায়, আছে খাদ্যের সংকট, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, সর্বোপরি মানবাধিকার বঞ্চিত। সেসব শিশুকে নিয়ে ভাবা দরকার। সেসব শিশুদের জীবন বাঁচানোর জন্য বিশ্ব বিবেকের জাগা দরকার। বিশ্বনেতাদের শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হবে। বিশ্বের সব দেশের সব স্তরের মানুষকে এক হয়ে যুদ্ধবাজ নেতাদের বয়কট করতে হবে। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে হবে যে, শক্তি পদর্শন করতে গিয়ে যেন একজন মানুষেরও প্রাণ না যায়, একটি শিশুও যেন না মরে। একজন বেসামরিক লোক মরলেও তার জবাবদিহিতা করতে হবে, এর জন্য আমরা সমবেত আওয়াজ তুলতে পারি। বিশ্বের সব দেশের নাগরিকই যেন খেয়ে-পরে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে আর কোনো আয়লানের জীবনপ্রদীপ যেন সাগরে আছড়ে না পড়ে, আর কোনো আয়লানকে যেন অভিবাসন নিতে গিয়ে দেশ ছাড়তে না হয়, জীবন দিতে না হয়।
আয়লানের বাবা আবদুল্লাহ পরিবার নিয়ে উন্নত বিশ্বে অভিবাসন করতে চেয়েছিলেন। রিফিউজি হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন আবদুল্লাহ। এখন দুই ছেলেকে সাগরে হারিয়ে বাকরুদ্ধ আবদুল্লাহ। কী নিষ্ঠুর এই পৃথিবীর খেলা! আবদুল্লার চেয়ে কে ভালো জানে তা! তারপরও আবদুল্লাহকে বেঁচে থাকতে হবে। হয়তো জীবনের তাগিদে আবদুল্লাহ আবার নতুন কোনো দেশে অভিবাসনের আশায় পাড়ি দিবেন সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-পর্বত। শোক ভুলে একটু নিশ্চিত জীবনের আশায় আশ্রয় চাইবেন উন্নত বিশ্বের অন্য কোনো দেশে। রিফিউজি হয়েই হয়তো কাটিয়ে দিবেন বাকি জীবন। কিন্তু আয়লান রিফিউজি হয়নি, যে আলো-বাতাসে বেড়ে উঠছিল, সেখানেই হয়তো আয়লান ভালো ছিল, যে বাড়িতে বাস করতে তার চৌহদ্দির ভেতরেই হয়তো আয়লানের সুন্দর একটি পৃথিবী ছিল। সাজানো, গোছানো। আয়লান নিজ দেশ নিজ ভূমি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়নি। আমার বিশ্বাস আয়লানের আত্মা পৃথিবীর সব সাগর-মহাসাগর, আকাশ, স্থলপথ ঘুরে ঘুরে মুক্ত জীবনে ভালো থাকবে। অন্ততপক্ষে একজন রিফিউজি আয়লান থেকে একজন সব থেকে মুক্ত আয়লান আমার কাছে স্বস্তির, শান্তির।
লেখক : সাংবাদিক

রুহুল আমিন