অভিমত
জঙ্গি প্রতিরোধে কৌশল কী হবে
পরপর তিনটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটার পর আমরা দেশবাসী এখন অপেক্ষা করছি, এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে? পয়লা জুলাইয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলা, তার মাত্র সাতদিন পর ৭ জুলাই ঈদের দিনে শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে হামলা এবং তার ১৯ দিন পর এই ২৬ জুলাই ২০১৬ সালেই ঢাকার কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান ও নয়জন সন্ত্রাসীর মৃত্যু, সব যেন এ কথায় ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’I একই মাসে এত ঘটনা একটি বিরাট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ‘আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী কি এত সব ঘটনা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিল?’
উল্লেখিত তিনটি ঘটনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে প্রথম দুটির সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী ছিল ‘রিয়্যাকটিভ’, আর শেষের ঘটনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী ছিল ‘প্রোয়্যাকটিভ’I অংকের হিসাবে দেখা যায়, আমাদের এই দেশীয় সন্ত্রাসীরা নিরাপত্তা বাহিনীর চেয়ে তিন ভাগের দুই ভাগ এগিয়ে আছে। যদি তাই হয়, তাহলে এ কথা সত্য যে নিরাপত্তা বাহিনী পেছনে আছে। সুতরাং সাধু সাবধান! কল্যাণপুরের এই সাময়িক সাফল্যে এত আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই।
গুলশান ও কল্যাণপুর, এই দুই ঘটনা থেকে আমাদের কিছু শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। সেগুলো হতে পারে (১) অনেক বড় বড় কথা বললেও আমরা এসব ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। এমনকি এই দেশে সন্ত্রাসীর কোনো অস্তিত্ব নেই এমন কথাও আমাদের খোদ সরকারের কেউ কেউ বলেছেন। (২) অপারেশন চালানোর ক্ষেত্রে আমরা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সময় নিয়েছি, (৩) সন্ত্রাস মোকাবিলায় বাহিনীগুলোর পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না, এমনকি তাদের অবস্থান রাজধানী ঢাকার অনেক দূরে ছিল (৪) সর্বশেষ যে কথাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ধরা দিয়েছে তা হলো ‘ইউজ অব ম্যাক্সিমাম ফোর্স’ আর ‘কো- ল্যাটেরাল ড্যামেজ’ এমন অবস্থারও অবতারণা হয়েছে উল্লেখিত আক্রমণ ও প্রো-আক্রমণের ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ, গুলশান আক্রমণে সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য অংশ নিয়েছিল।
লোকজন বলাবলি করছে, মাত্র কয়েকজন জঙ্গি পুরো বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। শোলাকিয়ার হামলায় একজন নিরীহ নারীর মৃত্য হয়েছে, আর ২৬ জুলাই তারিখের কল্যাণপুরের আক্রমণে আমরা দেখলাম পুলিশ, ডিবি, সোয়াত মিলে প্রায় শতাধিক জন অংশ নিয়েছেন। এই সবকিছু কর্মকাণ্ড অ্যান্টি-টেরোরিজম অপারেশনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এগুলো এখনই শোধরাতে হবে। আমরা মনে করি কল্যাণপুরের কর্মকাণ্ড আমাদের জন্য একটি মাইলস্টোন।
সন্ত্রাসীদের বলা হয় ‘ফিশ উইদিন দ্য ওয়াটার’ বা পানির ভেতরকার মাছ। চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সেতুং এমন ধারণার প্রবর্তক। তাঁর মতে, মাছ যেমন পানির ভেতরে বাস করে, দেখা যায় না, সন্ত্রাসীরাও জনগোষ্ঠীর মাঝে এমন করে বেঁচে থাকে। গুলশান বলুন, শোলাকিয়া কিংবা কল্যাণপুর বলুন, সব সন্ত্রাসীরাই মানুষের মাঝে নির্ভিঘ্নে ঘুরে বেড়িয়েছে, প্রশিক্ষণ নিয়েছে, অস্ত্র জোগাড় করেছে, আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে এবং সুযোগ বুঝে আক্রমণ রচনা করেছে। সুতরাং সন্ত্রাসীরা এখনো আছে, তারা যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো কায়দায় আক্রমণ করে বসতে পারে, এটাই সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয়। সরকারের এ কথা ভেবে পুলকিত হওয়ার কোনো কারণ নেই যে তাদের সফলতায় ঈর্শান্বিত হওয়ার লোক নেই। আশা করি তাঁরা সে রকম ভাবেন না। সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার লোকের অভাব নেই এই দেশে।
সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় দুটি কাজ খুব জরুরি। একটি হলো রাজনৈতিক, আরেকটি হলো সামরিক। রাজনৈতিক পদক্ষেপের মধ্যে প্রধান কাজ হলো ‘পানি থেকে মাছকে পৃথক করা’ অর্থাৎ এক কথায় আইসোলেশন বা পৃথককরণI সন্ত্রাসীদের তাদের আশ্রয়দাতাদের কাছ থেকে পৃথক করাই হবে প্রথম কাজ। এই পর্যায় প্রথম কাজটি হলো ‘উইনিং হার্টস অ্যান্ড মাইন্ড অব দ্য পিপল’ অর্থাৎ জনগণের হৃদয়-মন জয় করা I কী কারণে হঠাৎ করেই এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু হলো, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে বৈকি। সরকারের গোয়েন্দাদের আরো প্রোয়্যাকটিভ হতে হবে। জনগণকে আগাম সতর্ক করার উপায় বের করতে হবে। সাধারণত সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় পাঁচটি ‘থ্রেট লেভেল’ এবং তিনটি ‘রেসপন্স’ রয়েছে। থ্রেট লেভেল গুলো হল (১) ক্রিটিকাল : সন্ত্রাসী আক্রমণ আসন্ন (২) সিভিয়ার : সন্ত্রাসী আক্রমণ যে কোনো সময় (৩) সাবস্টেনশিয়াল : আক্রমণ শক্তিশালী হওয়ার শঙ্কা, (৪) মডারেট : আক্রমণ সম্ভব, কিন্তু সম্ভাবনা নেই এবং (৫) লো : আক্রমণের শঙ্কা কম। রেসপন্সগুলোর মধ্যে রয়েছে (১) এক্সসেপশনাল : সর্বাধিক প্রতিরক্ষামূলক নিরাপত্তাব্যবস্থা, (২) হাইটেন্ড : অতিরিক্ত ও টেকসই প্রতিরক্ষামূলক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং (৩) নরমাল : নিয়মমাফিক প্রতিরক্ষামূলক নিরাপত্তাব্যবস্থা I
ভবিষ্যতে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটবে কি না আমরা জানিনা। তবে আমাদের অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে। সরকারের উচিত অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এগুলো হতে পারে (১) সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। সরকার বলছে জাতীয় ঐক্য হয়েছে। আমরাও মনে করি হয়েছে। কিন্তু তা অনেকটা থিওরিটিক্যাল। গুলশানের এই ২o জনকে হত্যা জনগণ মোটেই সমর্থন করে রনা। এটাকেই হয়তো সরকার মনে করছে জাতীয় ঐক্য হয়েছে। কিন্তু সরকারকে আবার মনে করিয়ে দিতে চাই , সন্ত্রাসীরা হলো ‘ফিশ উইদিন দ্য ওয়াটার’, সুতুরাং তাদের ‘আইসোলেট’ করার সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। (২) অনতিবিলম্বে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল গঠন করা উচিত। তাদের দায়িত্ব হবে থ্রেট লেভেল নির্ধারণ ও রেসপন্স লেভেল ঠিক করা। কোন ফোর্স ও সেটি কী পরিমাণে কাউন্টার টেরোরিজমে অংশগ্রহণ করবে তা ঠিক করা, যাতে একটি সাধারণ প্রতি-আক্রমণে নিরাপত্তা বাহিনী টার্গেট এলাকায় গিজ গিজ না করে এবং নন-ট্যাকটিক্যাল রণকৌশলে লিপ্ত না হয়। (৩) সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর রণকৌশলগত প্রশিক্ষণ এই ক্ষেত্রে একই হবে। তাদের ‘ট্রেনিং টুগেদার’ এই ধারণায় নিজেদের যৌথভাবে প্রস্তুত করা। (৪) প্রত্যেক বাহিনীর মাঝে একটু আলাদা স্পেশাল ফোর্স থাকতে পারে। থ্রেট লেভেল অনুযায়ী তাদের নিয়োজিত করা যাবে। এতে সন্ত্রাসবিরোধী প্রতি-আক্রমণের ক্ষেত্রে সরকারে অনেক বিকল্প বা ‘ফ্লেক্সিবিলিটি অব চয়েস’ থাকবে।
লেখক : মেজর, পিএসসি,জি (অব.), বর্তমানে আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সিলেটে কর্মরত।

তারিকুল ইসলাম মজুমদার