অভয়নগরের ঐতিহ্যবাহী খানজাহান আলী মসজিদ
যশোরের অভয়নগর উপজেলার ভৈরব নদের তীরে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হযরত খানজাহান আলী (রহ.) জামে মসজিদ। প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর ধরে কালের বিবর্তন ও স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন বুকে ধারণ করে থাকা এই মসজিদটি আজও দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে জানা যায়, ১৫ শতকের শেষভাগে ইসলাম ধর্ম প্রচারক ও তৎকালীন খলিফাতাবাদের শাসক হযরত খানজাহান আলী (রহ.) তার অনুসারী ও বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যশোরের বারোবাজার থেকে ভৈরব নদের তীর ধরে পূর্বদিকে অগ্রসর হন। যাত্রাপথে জনকল্যাণে তিনি অসংখ্য রাস্তাঘাট নির্মাণ, দীঘি খনন ও ইবাদতের জন্য মসজিদ নির্মাণ করেন। খ্রিষ্টীয় ১৪৪৫ থেকে ১৪৫৯ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে শুভরাড়া গ্রামের এই মসজিদটি তিনি নির্মাণ করেন বলে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোর ও খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্গাকার এই মসজিদটির অভ্যন্তরীণ পরিমাপ ৫.১৩ বর্গমিটার। চার কোণে রয়েছে চারটি অষ্টকোণাকৃতি টারেট বা মিনার। উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ—এই তিন দিকে রয়েছে তিনটি প্রবেশদ্বার, যার মধ্যে পূর্ব দিকের প্রধান খিলানটি ১১ ফুট উচ্চতা ও ৬ ফুট ১০ ইঞ্চি প্রশস্ত। বিশেষ প্রাচীন ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত এই মসজিদের দেয়াল ও গম্বুজের কারুকার্য তৎকালীন সুলতানি আমলের স্থাপত্যকলার পরিচয় দেয়।
মসজিদটির পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন সমাধি, যা স্থানীয়ভাবে ‘জ্বিনের কবর’ নামে পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, খানজাহান আলী (রহ.) বাগেরহাটে চলে যাওয়ার সময় এখানে একজন খাদেমকে রেখে যান। তার মৃত্যুর পর মসজিদের পশ্চিম পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। এই সমাধিটি এক নজর দেখতে আজও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। এ ছাড়া পাশের বাশুয়াড়ী গ্রামে সুপেয় পানির অভাব মেটাতে মাত্র এক রাতে খনন করা একটি বিশাল দীঘিও পর্যটকদের কাছে যা বিশেষ আকর্ষণ।
দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত ও ধ্বংসস্তূপ হিসেবে পড়ে থাকার পর ১৯৬৩ সালে স্থানীয়রা এটি সংস্কার করে নামাজ আদায় শুরু করেন। পরবর্তীকালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং মূল কাঠামো ঠিক রেখে আয়তন বৃদ্ধি ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। বর্তমানে প্রতিদিন কয়েকশ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করছেন।
উপজেলার নওয়াপাড়া বাজার থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরত্বে সড়ক বা নদীপথে গাছগাছালি ঘেরা শুভরাড়া গ্রামের এই ঐতিহাসিক স্থানে পৌঁছানো যায়।
যশোরের এই প্রাচীন গৌরবকে সংরক্ষণ ও বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে স্থানীয় সচেতন মহল সরকারের প্রতি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।

তাওহীদ উসামা, যশোর (অভয়নগর-বাঘারপাড়া)