শেয়ার দরে কারসাজি ঠেকাতে কড়াকড়ি
পুঁজিবাজারে আইপিও প্রক্রিয়ায় গোপন সমঝোতা, কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো ও দর কারসাজি ঠেকাতে কড়াকড়ি আরোপের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একইসঙ্গে ফিক্সড প্রাইস নির্ভরতা থেকে সরে এসে বাজারনির্ভর বুক বিল্ডিং পদ্ধতিকে কার্যকর করার লক্ষ্যেই নতুন পাবলিক ইস্যু বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।
আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিএসইসির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। বিএসইসির পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিচালক হাসান মাহমুদ, অতিরিক্ত পরিচালক লুৎফুল কবির, যুগ্ম পরিচালক, জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল আলম প্রমুখ।
নতুন আইপিও বিধিমালায় কার্টেল গঠন, কৃত্রিম দর প্রস্তাব বা সক্ষমতার বাইরে গিয়ে দর দেওয়ার মতো কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে জানিয়ে আবুল কালাম বলেন, এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে ছয়টি নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নিয়ম ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। যাদের নির্দিষ্ট দামে শেয়ার কেনার বাস্তব সক্ষমতা নেই, তারা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি দর দিয়ে বাজারকে বিভ্রান্ত করতে না পারে— এজন্যই এসব বিধিনিষেধ।
আইপিও বিধিমালার খসড়া প্রকাশের পর বিনিয়োগকারী, প্রতিষ্ঠান ও বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে মোট ১৭০টি মতামত ও মন্তব্য পাওয়া যায় উল্লেখ্য আবুল কালাম বলেন, এর মধ্যে ৩৮টি ছিল বিস্তারিত বিশ্লেষণধর্মী মতামত, যেখানে কয়েকজন অংশীজন ২০০ পৃষ্ঠারও বেশি বিশ্লেষণ জমা দেন। এছাড়া ৩০টির মতো মতামত এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের কাছ থেকে।
তিনি বলেন, প্রাপ্ত প্রতিটি মন্তব্য কমিশনের সভায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। যেসব বিষয়ে একাধিক স্টেকহোল্ডারের মধ্যে মিল পাওয়া গেছে, সেসব বিষয় নতুন বিধিমালায় প্রতিফলিত হয়েছে। খসড়া ও চূড়ান্ত বিধিমালার মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তার পুরোটাই এসেছে এসব মতামত ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
কমিশনের মতে, ২০০৬ সালের আইপিও বিধিমালায় মেরিট মূল্যায়ন, ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন, স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ কিংবা ইস্যুয়ারের একাধিক স্টক এক্সচেঞ্জ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নতুন বিধিমালায় এসব বিষয় যুক্ত করা হয়েছে স্টেকহোল্ডারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই। একইসঙ্গে পরিষ্কার করা হয়েছে, কোনো ইস্যুয়ারকে বাধ্যতামূলকভাবে দুই স্টক এক্সচেঞ্জে আবেদন করতে হবে— এমন শর্ত নেই। ইস্যুয়ার তার পছন্দ অনুযায়ী যে কোনো একটি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে পারবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অতীতে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে আইপিওর দাম নির্ধারণ হতো মূলত দরকষাকষির মাধ্যমে, যা বাজারনির্ভর ছিল না এবং এতে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতো। এ কারণেই ২০১৫ সাল থেকে ধাপে ধাপে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যাওয়া হয়। নতুন বিধিমালায় ইন্ডিকেটিভ প্রাইস নির্ধারণকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করা হয়েছে। এখন ইস্যুয়ার ও ইস্যু ম্যানেজারকে ভ্যালুয়েশন পদ্ধতির মাধ্যমে ইন্ডিকেটিভ প্রাইস যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করতে হবে। পাশাপাশি রোড শোর মাধ্যমে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও মূল্য-ইচ্ছা যাচাই করে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ চাহিদার ভিত্তিতে ইন্ডিকেটিভ প্রাইস যাচাই করতে হবে। শুধু একটি মূল্য প্রস্তাব করলেই চলবে না— সেই দামে কত শেয়ার কেনার সক্ষমতা ও আগ্রহ আছে, সেটিও প্রমাণ করতে হবে।
২০২০ সালের সংশোধনীতে নেট অ্যাসেট ভ্যালু ও আর্নিংস বেসড ভ্যালুর গড়ের ওপর ২০ শতাংশ তারতম্যের যে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ছিল, সেটিকে কার্যত ফিক্সড প্রাইস বলে মনে করছে কমিশন। নতুন বিধিমালায় সেখান থেকে সরে এসে প্রকৃত বুক বিল্ডিংয়ের দিকে যাওয়া হয়েছে। কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর রেগুলেটরি সংস্কারে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ওই টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে এরই মধ্যে মার্জিন রুল, মিসইউজ অব ফান্ড এবং পাবলিক ইস্যু বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
কমিশন জানিয়েছে, শিগগির করপোরেট গভর্ন্যান্স ও অডিট প্যানেল সংক্রান্ত গাইডলাইনও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। আবুল কালাম বলেন, আইপিও নিয়ে যে সমস্যাগুলো সাংবাদিকসহ বাজার সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরেছেন, সেগুলোর সমাধান করতেই এই সংস্কার। আমরা বিশ্বাস করি, নতুন বিধিমালা বাজারনির্ভর, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য আইপিও প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক