এক মাসেই রেণউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়ারপ্রতি দর বাড়ল ৪২৯ টাকা
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত লোকসানে ডুবে পড়া রেণউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানির (বিডি) মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দাঁড়িয়েছে ৯৮০ পয়েন্টে। পিই রেশিও হিসেবে কোম্পানিটিতে বিনিয়োগ এখন ঝুঁকিতে। এর মধ্যেও কোম্পানিটির শেয়ার দর লাগামহীন বেড়েছে। মাত্র এক মাসেই কোম্পানির শেয়ারপ্রতি দর কারণ ছাড়াই বাড়ল ৪২৯ টাকা। ঝুঁকিপূর্ণ সত্ত্বেও কোম্পানিটির শেয়ার দর এতো বৃদ্ধির বিষয়টি ইতোমধ্যে নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে সিকিউরিটিজ হাউজগুলোতে। এরই ধারায় শেয়ারের দর ও লেনদেনে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির কারণে গত বুধবার হঠাৎ করেই ওইদিনের জন্য রেণউইক যজ্ঞেশ্বরের লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ।
ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ডিএসইতে রেণউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়ারপ্রতি সমাপনী দর ছিল ৯৭৯ টাকা ৬০ পয়সা। এক মাস আগে বা ১৮ জুন কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সমাপনী দর ছিল ৫৫০ টাকা ২০ পয়সা। মাত্র এক মাসে শেয়ারপ্রতি দর বেড়েছে ৪২৯ টাকা ৪০ পয়সা বা ৭৮ দশকিম শূন্য চার শতাংশ। আর শেষ এক সপ্তাহে শেয়ারপ্রতি দর বেড়েছে ২১০ টাকা ২০ পয়সা বা ২৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। গতকাল বৃহস্পতিবার মোট শেয়ারের মাধ্যমে বাজারে মূলধন দাঁড়িয়েছে ১৯৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। গত ১৮ জুন বাজার মূলধন ছিল ১১০ কোটি চার লাখ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে বাজারে মূলধন বেড়েছে ৮৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আরও এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে মূলধন বেড়েছে ৪২ কোটি চার লাখ টাকা।
অপরদিকে কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ঘোষণা ছাড়াই কোম্পানিটির শেয়ারের অস্বাভাবিক উত্থান ডিএসইর নজরে আসে। শেয়ার দর বাড়ার কারণে সম্প্রতি কোম্পানিটিতে ডিএসই নোটিস পাঠিয়েছিল। এর জবাবে চলতি মাসের ৮ জুলাই কোম্পানিটি জানায়, কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ার দর বাড়ছে। ওইদিন (৮ জুলাই) শেয়ারপ্রতি দর ছিল ৭১৫ টাকা ৮০ পয়সা। পরে যেন শেয়ার দরের গতি আরও বেড়ে যায়। শেয়ার দর বেড়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দাঁড়ায় ৯৭৯ টাকা ৬০ পয়সা। এতো দর বাড়ায় এই কোম্পানিতে বিনিয়োগ নিয়ে বিপাকে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। পরে গত বুধবার (১৫ জুলাই) শেয়ারের দর ও লেনদেনে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির কারনে লেনদেন চলা অবস্থায় হঠাৎ করেই ওইদিনের জন্য রেণউইক যজ্ঞেশ্বরের লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করে ডিএসই কর্তৃপক্ষ।
এ প্রসঙ্গে ডিএসই একাধিক কর্মকর্তা জানায়, কোম্পানিটির শেয়ার দর বৃদ্ধির সঙ্গে বাস্তব ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কোনো সুস্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে না। শেয়ার দর বৃদ্ধির পেছনে গোপন তথ্য, সমন্বিত লেনদেন বা বাজার কারসাজির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোম্পানির কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও অতিরিক্ত তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার কোম্পানিটির পিই রেশিও দাঁড়ায় ৯৭৯ দশমিক ৬০ পয়েন্টে। পিই রেশিও অনুসারে কোম্পানিতে বিনিয়োগ নিরাপদে রয়েছে। পুঁজিবাজারের কোনো কোম্পানির পিই রেশিও যদি সিঙ্গেল ডিজিটে থাকে, তাহলে সেখানে বিনিয়োগ সম্পূর্ণ নিরাপদ ধরে নেওয়া হয়। এছাড়া পিই রেশিও ডিজিট যদি ১৫ পয়েন্ট পর্যন্ত অবস্থান করে, তবে সেখানেও বিনিয়োগ নিরাপদ বলে ধরা হয়ে থাকে। তবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) মার্জিন ঋণের যোগ্যতা হিসাবে সর্বোচ্চ ৪০ পিই রেশিও বেঁধে দিয়েছে। সেই হিসেবে ৪০ পর্যন্ত পিইধারীর শেয়ার বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ বলে জানায় বিএসইসি। অর্থাৎ পিই রেশিও ৪০ এর ওপরে গেলে বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পিই রেশিও যত বাড়বে ঝুঁকির মাত্রা তত বাড়তে থাকবে। পিই রেশিও হিসেবে রেণউইক যজ্ঞেশ্বরের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে আছে।
কোম্পানির তথ্য মতে, গত অর্থবছরের (২০২৫-২০২৬) তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) আর্থিক প্রতিবেদনে রেণউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে এক টাকা ৭২ পয়সা। আগের অর্থবছরের (২০২৪-২০২৫) তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ৯ টাকা পাঁচ পয়সা। গত অর্থবছরের তিন প্রান্তিকের (জুলাই-মার্চ) আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে সাত টাকা ১৪ পয়সা। আগের অর্থবছরের তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ১৫ টাকা ৬১ পয়সা। গত তিন প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ হয়েছে নেগেটিভ পাঁচ টাকা ৯ পয়সা। আলোচিত তিন প্রান্তিক শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে নেগেটিভ ১১২ টাকা ৭৩ পয়সা।
এর আগে লোকসানের পড়ায় কোম্পানিটি ২০২৪-২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরে (জুলাই-জুন) বিনিয়োগকারীদের কোন ধরনের লভ্যাংশ দিতে পারেনি। ওই অর্থবছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হযেছিল সাত টাকা ৭৬ পয়সা। শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ হয়েছিল নেগেটিভ ১৬ টাকা ৫৭ পয়সা। শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছিল নেগেটিভ ১০৫ টাকা ৫৯ পয়সা। লোকসান কারনে আগে কয়েক অর্থবছরের বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে পারেনি কোম্পানিটি।
১৯৮৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় প্রকৌশল খাতে প্রতিষ্ঠান রেণউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি (বিডি)। জেড ক্যাটাগরির এই কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ২০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন দুই কোটি টাকা। শেয়ার সংখ্যা ২০ লাখ। কোম্পানিটির ৫১ শতাংশ শেয়ার সরকারের হাতে রয়েছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালকরা ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ৩৪ দশমিক ৫০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক