আমরা কবে সত্যিকারের বড় দল হবো?

“মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাব
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে!
নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এই ঘরের ছাদ
ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে?”
কবিতাংশটি সবার পরিচিত হওয়ারই কথা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’- এর কয়েকটি লাইন এমন। সেই ছোট্ট ছেলেটি অনেক বড় হয়ে যাওয়ার পরও তাকে তিন প্রহরের বিল দেখাতে নেয়নি।
আচ্ছা, বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কবিতার এই কয়েকটি লাইনের মিল কোথায়? যদি বাংলাদেশের ক্রিকেটের খোঁজখবর রাখেন, তাহলে নিশ্চয়ই জানেন, আমরা মুখে মুখে বড় দল। অর্জনের খাতায় বিশাল শূন্য বাদ দিয়ে আমাদের সবই আছে। প্রতিভাবান তারকা, একাই ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেওয়ার মতো খেলোয়াড় কিংবা সংবাদ সম্মেলন কাঁপানো অধিনায়ক। তাদের কথা শুনে, কীর্তিকলাপে দর্শক আশায় বুক বাঁধে—এইবার বুঝি বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে পতাকা উঁচিয়ে ধরবেই!

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোটামুটি ২৫ বছর পার হয়েছে বাংলাদেশের। শিক্ষানবিশকাল ধরলে আরও বেশি। কিন্তু, আমাদের শিক্ষা নেওয়া শেষই হয় না যেন। প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের আগে আমাদের অধিনায়ক থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের যে খই ফোটে, কথার সেই ফুলঝুরি মাঠে রান বা উইকেটে রূপান্তর হলে, এতদিনে সত্যিই এ দেশে কত কী হয়ে যেত!
চীনা একটি প্রবাদ আছে— ‘ধীরে চলতে ভয় পেয়ো না, এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকাকে বরং ভয় করো।’ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ দলের যদি উন্নতি দৃশ্যমান হতো, তবু আশা ছিল। দৃশ্যমান উন্নতি নেই, উল্টো দিন দিন অবনতি ঘটছে। ক্রিকেট কাঠামো বলতে কিছু একটা থাকা দরকার। যা আছে, তার মান কতটা উন্নত, সেটি জাতীয় দলের পারফরম্যান্স দেখলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আমরা এক জায়গায় স্থির হয়ে আছি। কাজে নয়, কথায় বিশ্বাসী!
‘সৃজনশীলতা তাকেই বলে যেখানে যাছাই-বাছাই হবে, আবিষ্কার হবে, উন্নতি হবে। ঝুঁকি নেওয়ার সাহস থাকবে কিন্তু নিয়ম ভাঙার ভয় থাকবে না। ভুল হবে, তবে আনন্দ থাকবে’—প্রয়াত মার্কিন অভিনেত্রী মেরি ল্যু কুক বলেছিলেন কথাগুলো। ভুল কিছু বলেছিলেন?
একটা কাজ করতে গেলে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। সেখানে ভুলত্রুটি হবে, প্রচলিত ধারা ভাঙবে, শেকল ভাঙার গান থাকবে। তবেই তো দাঁড়াবে একটা অবয়ব। সেটি ধীরে হোক, কিন্তু যখন অঙ্কুর থেকে চারা উঠবে, সবাই দেখবে, হবে আনন্দ।

কে জানে, কোন অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশ দল এই সাহসের কাজটাই করে উঠতে পারছে না। যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর, ম্যাচের পর ম্যাচ একঘেয়ে ক্রিকেট খেলে যাচ্ছে। দর্শক যেখানে বিরক্ত হয়, প্রশ্ন জাগে, ক্রিকেটারদের বিরক্তি লাগে না? বোধকরি না। তারা খেলেন, খেলতে হয় বলে। তারকাখ্যাতি তৈরি করেন, কদিন ভালো খেলেন, তারপর আশা জাগিয়ে হতাশার কূপে ফেলেন দর্শকদের।
আইসিসির সর্বশেষ তিন ইভেন্ট—ওয়ানডে বিশ্বকাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ চূড়ান্ত ব্যর্থ। ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে ব্যর্থতার বৃত্তে। এখান থেকে বের হওয়ার উত্তর জানা নেই কারো। হতে পারে আগ্রহও নেই। বড় দল না হয়েও যখন বড়দের মতো ভাব নেওয়া যায়, কষ্টের প্রয়োজন আদৌ আছে কি?