প্রত্যাশা আর নতুনত্বের আবহ নিয়ে ফিরছে বিপিএলের নিলাম
বাংলাদেশের একমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)। ২০১২ সালে অনেক আশা-প্রত্যাশা আর জৌলুস নিয়ে শুরু হয়েছিল টুর্নামেন্ট। ১১তম আসর শেষে ১২তম আসর দোরগোড়ায়। এই সময়ে কতটুকু প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে, সেই প্রশ্ন একপাশে রেখে নতুনভাবে শুরু হচ্ছে বিপিএলের আরেকটি আসর। এবারের আসরকে সব দিক থেকেই ভিন্ন বলা চলে।
আগামী ২৬ ডিসেম্বর মাঠে গড়াবে বিপিএলের ১২তম আসর। বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি নির্ধারণ থেকে শুরু করে নিলাম, উদ্বোধন—সবই হচ্ছে এবার নতুন রঙে, নতুন আবহে। দর্শকরাও আশায় বুক বেঁধেছেন বিপিএলের নতুন রং দেখার। তার আগে দেশের একমাত্র এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের নিলামসহ সব পরিবর্তনের খুঁটিনাটি রইল এনটিভি অনলাইনের পাঠকদের জন্য।
এক যুগের অবসান শেষে ফিরল নিলাম
বিপিএলের প্রথম আসর অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১২ সালে। সেই আসরে দেখা গিয়েছিল হাতুরির বাড়ি, অর্থাৎ নিলাম পদ্ধতিতেই শুরু হয়েছিল বিপিএল। পরের আসরেরও দেখা গিয়েছিল সেটি। কিন্তু এরপর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে প্লেয়ার্স ড্রাফট পদ্ধতিতে যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
সেই সিদ্ধান্তের পর চলে গেছে আরও ৯টি আসর। বছরের হিসাবে এক যুগ। সবকিছুতে পরিবর্তন আসলেও নাজমুল হাসান পাপনের বোর্ডের সিদ্ধান্তে আর পরিবর্তন আসেনি। এবার ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর চাওয়াতে সেই অপেক্ষা ফুরোচ্ছে। বিপিএলে ফিরছে নিলাম। রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে রোববার (৩০ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে নিলাম।
৬ ক্যাটাগরিতে ১৫৭ দেশি ক্রিকেটার
এবারের বিপিএলে মোট ৬টি ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে দেশি ক্রিকেটারদের। খসড়া তালিকায় নাম ছিল ১৬৬ জন ক্রিকেটারের। তবে চূড়ান্ত বাদ দেওয়া হয়েছে ৯ জনকে, একজন নাম তুলে নিয়েছেন আর নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে একজনকে। ফলে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৭ জনে।
দেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির ভিত্তিমূল্য করা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। এরপর যথাক্রমে ‘বি’ ক্যাটাগরি ৩৫ লাখ, ‘সি’ ক্যাটাগরি ২২ লাখ, ‘ডি’ ক্যাটাগরি ১৮ লাখ, ‘ই’ ক্যাটগরি ১৪ লাখ ও ‘এফ’ ক্যাটাগিরির ভিত্তিমূল্য ১১ লাখ টাকা।
বিদেশি ক্রিকেটার বেশি ইংল্যান্ডের, পাল্লায় পাকিস্তান–শ্রীলঙ্কাও
বিপিএলের এবারের আসরের নিলামের জন্য রেজিষ্ট্রেশন করেছিল ৫০০ বিদেশি ক্রিকেটার। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়েছে ২৪৫ জন ক্রিকেটারকে। নিলামের জন্য সবচেয়ে বেশি বিদেশি ক্রিকেটার রেজিস্ট্রেশন করেছেন ইংল্যান্ড থেকে। তবে এদের বেশির ভাগই কাউন্টি কিংবা অন্যান্য ঘরোয়া টুর্নামেন্ট খেলা।
ইংল্যান্ডের পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪১ ক্রিকেটার রেজিস্ট্রেশন করেছে পাকিস্তান থেকে। শ্রীলঙ্কা থেকে করেছেন ৩৫ জন ক্রিকেটার। ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকেও আছেন ৩০ জন ক্রিকেটার। এছাড়াও আফগানিস্তান থেকে ১৫, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ১০, জিম্বাবুয়ে থেকে ৭, নেপাল থেকে ৫, ভারত থেকে ৩, নেদারল্যান্ডস থেকে ৩, আরব আমিরাত থেকে ২ এবং নামিবিয়া, কানাডা ও সুইডেন থেকে একজন করে ক্রিকেটার রেজিস্ট্রেশন করেছেন।
বিদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির ভিত্তিমূল্য ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার মার্কিন। এরপর যথাক্রমে ‘বি’ ক্যাটাগরি ২৫ হাজার, ‘সি’ ক্যাটাগরি ২০ হাজার, ‘ডি’ ক্যাটাগারি ১৫ হাজার ও ‘ই’ ক্যাটাগরির ভিত্তিমূল্য ১০ হাজার ডলার।
যেভাবে হবে বিপিএলের নিলাম
নিলাম হবে দুই ধাপে। প্রথম ধাপে স্থানীয় ক্রিকেটারদের এবং পরের ধাপে বিদেশি ক্রিকেটারদের। দেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির প্রতি ডাকে বাড়বে পাঁচ লাখ টাকা করে। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে বাড়বে ৩ লাখ, ‘সি’ ক্যাটাগারিতে ১ লাখ টাকা। এরপর বাকি তিন ক্যাটাগরিতে প্রতি ডাকে বাড়বে ৫০ হাজার টাকা করে।
নিলাম থেকে ন্যূনতম ১২ জন দেশি ক্রিকেটারকে দলে ভেড়াতে হবে ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোকে। আর সরাসরি চুক্তির দুই ক্রিকেটার দিয়ে সেই সংখ্যা হবে ১৪ জন। সর্বোচ্চ ১৬ জন দলে ভেড়ানো যাবে।
অন্যদিকে, বিদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির প্রতি ডাকে মূল্য বাড়বে পাঁচ হাজার ডলার করে। ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ ও ‘ই ’ ক্যাটাগরিরর যথাক্রমে প্রতি ডাকে বাড়বে ৩ হাজার, ২ হাজার ১ হাজার ৫০০ আর এক হাজার ডলার।
এর বাইরে সরাসরি চুক্তিতে দুজন বিদেশি ক্রিকেটারকের দলে ভেড়াতে পারবে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। নিলাম থেকে নিতে নূন্যতম দুজন ক্রিকেটারকে। তবে সর্বোচ্চ কতজনকে নেওয়া যাবে সেই সংখ্যা নির্ধারিত নয়।
দেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে ক্যাটাগরি ‘এ’ ও ‘বি’ থেকে কমপক্ষে দুজন ক্রিকেটার দলে ভেড়াতে হবে। ‘সি’ ও ‘ডি’ থেকে নিতে হবে ৬জন আর ‘ই’ ও ‘এফ’ ক্যাটাগরি থেকে ৪ জনকে দলে নিতে হবে।
প্রথমধাপের নিলাম শেষে অবিক্রিত থাকা দেশি ক্রিকেটারদের নিয়ে দ্বিতীয়ধাপে নিলাম শুরু হবে। তবে এই ধাপে ক্যাটাগরি ‘এ’ থেকে ‘ই’ একধাপ করে নিচে নেমে যাবে। অর্থাৎ ক্যাটাগরি ‘এ’-কে তখন বিবেচনা করা হবে ক্যাটাগরি ‘বি’ হিসেবে।
দলগুলো কত টাকা খরচ করতে পারবে?
ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে দল গঠনে মোট ১০কোটি টাকা খরচের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি খেলোয়াড় কেনার জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আর দেশি খেলোয়াড় কেনার জন্য ব্যয় করতে পারবে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
বদলে যাচ্ছে ট্রফি
এখন পর্যন্ত কয়েকবার বদল এসেছে বিপিএলের ট্রফিতে। কিন্তু একবারও সেটি মনে ধরেনি দর্শকদের। বর্তমান ট্রফিকে অনেকেই ট্রোল করেন ‘হারিকেন’ বলে। তবে আশার খবর হলো, এবার বিপিএলের ট্রফিতেও পরিবর্তন আসছে।
নাম নিয়ে হতাশা আর নয়
বিপিএল যখন শুরু হয় তখন হাতেগোনা দুয়েকটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট ব্যতীত আর কোনো টুর্নামেন্টের অস্তিত্ব ছিল না। আইপিএলের পরই ধরা হতো বিপিএলকে। কিন্তু আস্তে আস্তে প্রমোশন না হয়ে বরং ডিমোশন হয়েছে বিপিএলের। মান গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে।
আইপিএলের মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স-দিল্লি ক্যাপিটালস কিংবা পিএসএলের লাহোর কালান্দার্স-ইসলামাবাদ ইউনাটেডের মতো বিপিএলে ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারেনি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। যদি প্রশ্ন করা হয়, কেন এই অবস্থা? উত্তর খুবই সহজ—বিপিএলের প্রতি আসরেই বদলায় ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা, সেই সঙ্গে বদলায় দলের নাম।
সেই ধারায় এবার পরিবর্তন এনেছে বিসিবি। আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা। তবে, ক্ষমতা নিজ হাতে রেখে দিয়েছে বিসিবি। পাঁচ বছর শেষে কোন প্রতিষ্ঠান মালিকানা ছেড়ে দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সকল ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি বুঝিয়ে দিয়ে যেতে হবে বিসিবি। নতুন মালিককে বিসিবি আবার সেগুলো বুঝিয়ে দেবে। ফলে, দলের নাম আর পরিবর্তন হচ্ছে না।
সূচীতেও থাকছে নতুনত্ব
সেই শুরুর আসর থেকে এখন পর্যন্ত বিপিএলের রেওয়াজ হলো, শুরু হবে ঢাকা থেকে। এরপর সিলেট, চট্টগ্রাম ঘুরে আবার ঢাকায় এসে শেষ হবে। তবে এবার আসছে ভিন্নতা। বিপিএলের ১২তম আসর শুরু হবে সিলেট থেকে। এরপর চট্টগ্রাম ঘুরে ফিরবে ঢাকায়।
বদলে যাচ্ছে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান
দেশের বড় একটা অংশের মানুষ খেলা উপভোগ করেন টেলিভিশনে। কিন্তু সেই উপভোগ খুব একটা সুখকর হয় না তাদের জন্য। সম্প্রচারের মান নিয়ে তাই সমালোচনা অনেক পুরনো। গত তিন আসরে বিপিএল সম্প্রচারের দায়িত্বে ছিল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান রিয়াল ইম্প্যাক্ট। নতুন আসরে আর থাকছে না তারা। এবার বিপিএলের সম্প্রচার করবে ট্রান্স প্রোডাকশন অ্যান্ড টেকনোলজি (টিপিটি)।
সবমিলিয়ে দর্শকদের আশা-প্রত্যাশার পারদ বাড়িয়ে শুরু হতে যাচ্ছে বিপিএলের ১২তম আসর। এত এত পরিবর্তন এবার কতটা সফল হয় সেই অপেক্ষা দর্শক-সমর্থকদের।

নাজমুল সাগর