অসমাপ্ত ক্রিকেট ম্যাচ থেকে বিসিবির চেয়ারে ‘ক্রিকেটার’ তামিম
সদ্যই জাতীয় দলকে বিদায় জানিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে মনোযোগ দিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। তবে সহসা ছেদ পড়ে সেই মনোযোগে। এরপর পুরো দেশের মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন তামিম। ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ সাভারের বিকেএসপিতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) মোহামেডানের হয়ে খেলতে নেমেছিলেন। অধিনায়ক হিসেবে টসও করেছিলেন। এরপর হঠাৎই মাঠে হার্ট অ্যাটাক হয় তার। দ্রুতই নেওয়া হয় হাসপাতালে। সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরেন তামিম।
এরপর কেটে গেছে এক বছর, মাঝে ঘটেছে অনেক ঘটনা। বদলেছে সরকার, বিসিবির চেয়ারের পালাবদল হয়েছে তিনবার। নানান বাক বদল শেষে তামিম এখন বিসিবি সভাপতি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) বিসিবির ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে। যেখানে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই ‘ক্রিকেটার’ কে।
সাধারণত তামিম ইকবালের নামের আগে ‘সাবেক ক্রিকেটার’ লেখার কথা। কারণ, সেবার মাঠে অসুস্থ হওয়ার পর থেকে আর ২২ গজে নামেননি তিনি। প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের বাইরে কোনো চ্যারিটি ক্রিকেটেও দেখা যায়নি তামিমকে। এর পেছনে অবশ্য ছিল ডাক্তারের কড়া নিষেধাজ্ঞা।
গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছিল তামিমের ক্রিকেটের ২২ গজে ফেরা নিয়ে। বিশেষ করে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে তার মধুর সখ্যতার কারণে। সব আলোচনায় ‘ফুলস্টপ’ টেনে দিয়ে নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তামিম।
সাধারণত, জাতীয় দলকে বিদায় বলার পরও আরও কয়েক বছর ঘরোয়া ক্রিকেটে চালিয়ে যান ক্রিকেটাররা। এরপর ইতি টানেন পুরো ক্রিকেট ক্যারিয়ারের। তবে, তামিম ইকবাল এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেটকে পুরোপুরি বিদায় বলেননি।
বিসিবির সর্বশেষ নির্বাচনের আগেও তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল খেলা নিয়ে। সেসময় তামিম বলেছিলেন, ‘এটা কোনো জায়গায় লেখা নেই যে, (বিসিবিতে নির্বাচিত হলে) আমি খেলতে পারব না। তাই অফিশিয়ালি আমাকে এখানে ঘোষণা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।’
তামিমের বিসিবিতে আসার শুরুটা অবশ্য আরও আগের। এর পেছনে আছে অনেক গল্প, অনেক ঘটনা। গল্পের টাইমলাইনটা শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাধ্যমে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপর সরকারের অনেক এমপি-মন্ত্রী দেশ ছেড়ে পালান। সেই দলেই ছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী এবং বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। অবসান ঘটে বিসিবিতে পাপনের এক যুগের রাজত্বের।
অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয় আন্দোলনের সম্মুখ সারির নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি যেদিন প্রথম মিরপুরে যান, সেদিন আসিফ মাহমুদকে ঘুরে ঘুরে মিরপুরের ঘুঁটিনাটি দেখান তামিম ইকবাল।
এরপর থেকে আসিফ মাহমুদের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক দেখা যায় তামিমের। ক্রিকেটের বাইরেও ক্রীড়াঙ্গনের যেসব অনুষ্ঠানে ক্রীড়া উপদেষ্টা অংশ নিতেন সেখানেই দেখা যেত জাতীয় দলের সাবেক এই ক্রিকেটারকে। এমন সম্পর্ক দেখে অনেকেই অনেকরকম ধারণা পোষণ করেছিলেন। সব ধারণা ভুল প্রমাণ হয় ২০২৫ সালে বিসিবি নির্বাচনের আগে। এখান থেকেই দূরত্ব শুরু হয় দুজনের সম্পর্কে। এক সময় সেটি চরম তিক্তকায় রূপ নেয়। বিষয়টি দাঁড়ায়, ‘বটির সঙ্গে মাছের সম্পর্কের’ মতোই।
বিসিবি নির্বাচনে সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনেন তামিম। তার সঙ্গে যোগ দেন আরও কিছু ক্লাবের কাউন্সিলররা। ঢাকা-৬ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তামিম। তামিমকে সঙ্গে নিয়ে বিসিবি ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দেন ইশরাক।
বিসিবি নির্বাচনের এই ঘটনা গড়ায় হাইকোর্ট অব্দি। অবশ্য এতেও শেষ পর্যন্ত থামানো যায়নি নির্বাচন। অবস্থা দেখে নির্বাচন বয়কট করেন তামিম এবং সেই ক্লাব কাউন্সিলররা। নির্বাচনে অস্বচ্ছতার অভিযোগ আনেন তারা।
সবকিছুর পরও বিসিবি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত বছর। নির্বাচনে প্রথমে পরিচালক পদে জয়লাভ করেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। পরবর্তীতে বাকি পরিচালকদের ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।
নির্বাচনের পর থেকে বুলবুলের এই বোর্ডকে অবৈধ বোর্ড হিসেবে দাবি করে আসছিলেন তামিম। একই কথা ছিল নির্বাচন বর্জন করা ক্লাবগুলোর কাউন্সিলরদেরও। পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে একযোগে সব ধরণের ক্রিকেট না খেলার ঘোষণা দেন এই কাউন্সিলররা। ফলে অনেকটাই অচলাবস্থার মধ্যে পড়ে যায় দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দুই তৃতীয়াংশ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক গোলরক্ষক আমিনুল হককে।
এরপর থেকে আবারও আলোচনায় আসে বিসিবির নির্বাচন। তামিম ইকবালকে দেখা যায় বর্তমান অ্যাডহক কমিটিতে থাকা তিনজন মন্ত্রী পুত্রের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। এতে গুঞ্জন আরও চড়াও হয় বিসিবিতে বুলবুলের স্থায়িত্ব নিয়ে।
বিসিবি নির্বাচনের সময় হাইকোর্টে দায়ের করা মামলা এখনও চলমান। এরই মাঝে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। বিভিন্ন পরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ডাকা হয় আসিফ মাহমুদকেও।
আসিফ মাহমুদ তদন্ত কমিটির ডাকে সাড়া দেননি। উল্টো যেন বোমা ফাটান। বিসিবি নির্বাচনের আগে সামনে আসে অনেক আলোচনা। এমনকি নির্বাচনে দরকষাকষির খবরও সামনে আসে তখন। পুরোনো বিষয়টিই আবার প্রকাশ্যে আনেন আসিফ মাহমুদ। সম্প্রতি এক পডকাস্টে তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা নির্বাচনের সময়ের কিছু ব্যাপার তুলে ধরেন।
পডকাস্টে তিনি বলেন– ‘আলোচনার টেবিলে তামিম দাবি করেন, ক্লাব কোটা থেকে তাদের পক্ষের ১২ জন পরিচালক দিতে হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের পর পরিচালনা পর্ষদে ফিন্যান্স, পার্চেস ও ফ্যাসিলিটিজ কমিটির দায়িত্ব দিতে হবে এই পরিচালকদের।’ তামিমের এমন দাবি মেনে নেননি বলে জানান আসিফ মাহমুদ।
বিভিন্ন জনের সাক্ষাৎকার শেষে গত ৫ এপ্রিল এনএসসিতে প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি। এর দুদিন পর মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেয় এনএসসি। নতুন করে গঠন করা হয় অ্যাডহক কমিটি। যার সভাপতি করা হয় তামিম ইকবালকে।
তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বিসিবি কতদূর যাবে, সেটি সময়ের হাতে। আপাতত তার কমিটির কাজ তিন মাসের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খোদ তামিম।

নাজমুল সাগর