মরক্কোর বিশ্বকাপ মিশন : বুনো-হাকিমিদের সামনে প্রমাণের মঞ্চ
ফুটবল ইতিহাসের পাতায় কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর সমর্থকদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার এক অবিশ্বাস্য রূপকথা লিখেছিল তারা। স্পেনের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারের জয় কিংবা কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে ১-০ ব্যবধানে স্তব্ধ করে দেওয়ার সেই সোনালী স্মৃতি এখনো দেশটির সমর্থকদের রোমাঞ্চিত করে।
ফুটবল দুনিয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন— কাতারের সেই সাফল্য কি কেবলই একটি আকস্মিক ঝলক ছিল? এই সন্দেহের জাল ছিঁড়ে নিজেদের ফুটবলীয় শক্তির প্রমাণ দিতে এবার উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে পা রাখছে মরক্কো। এটি বিশ্বমঞ্চে তাদের সপ্তম আসর এবং দেশটির ইতিহাসে প্রথমবার টানা তিনবার বিশ্বকাপে খেলার নজির। লক্ষ্য একটাই—কাতারের গর্জন এবার আমেরিকার মাটিতেও প্রতিধ্বনিত করা।
ডাগআউটের আকস্মিক বদল: মোহাম্মদ ওয়াহবির আগমন
বিশ্বকাপের মহোৎসব শুরু হতে যখন ১০০ দিনেরও কম সময় বাকি, ঠিক তখনই এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেয় মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন। ইতিহাস গড়া প্রধান কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুইয়ের স্থলাভিষিক্ত করে ডাগআউটের হট সিটে বসানো হয়েছে বেলজিয়ামে জন্মগ্রহণকারী ৪৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ ওয়াহবিকে।
বিখ্যাত আরএসসি অ্যান্ডারলেখটের ট্রেনিং সেন্টারে কোচিং করিয়েছেন ওয়াহবি। এরপর মরক্কোর নতুন কোচ ওয়াহবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের জাত চিনিয়েছেন চিলির মাটিতে অনুষ্ঠিত ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ২০২৫ জিতে। তার অধীনেই মরক্কোর অনূর্ধ্ব-২০ দল ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ২-০ ব্যবধানে পরাজিত করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
এবারের বিশ্বকাপ দলেও চমক রেখেছেন তিনি। বিশ্বকাপ জয়ী সেই যুব দল থেকে তার দুই প্রিয় শিষ্য ওসমানে মাম্মা এবং ইয়াসির জাবিরিকে সিনিয়র দলে ডেকেছেন ওয়াহবি। এখন বিশ্বকাপে তাদের কিভাবে ব্যবহার করেন, তা দেখতে মুখিয়ে আছে সবাই। ঘরের মাঠের সমর্থকদের একইভাবে অনুপ্রাণিত করে ২০৩০ সালের যৌথ বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে মরক্কোকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ওয়াহবি।
প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট
বাছাইপর্বের আফ্রিকান অঞ্চলে ‘ই’ গ্রুপের শীর্ষ স্থান দখল করে সবার আগে মূল পর্বের টিকিট কাটে অ্যাটলাস লায়ন্সরা। ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নাইজারের বিরুদ্ধে ৫-০ গোলের জয় দিয়ে তারা নিশ্চিত করে উত্তর আমেরিকার বিমানের টিকিট। পুরো বাছাইপর্বে তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবল ও জমাট ডিফেন্স প্রতিপক্ষের জন্য ত্রাস সৃষ্টি করেছিল।
তবে রেগ্রাগুইয়ের বিদায়ের আগে ঘরের মাঠে ২০২৫ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপার খুব কাছে গিয়েও ফাইনালে সেনেগালের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে রানার্স-আপ হওয়ার সেই ক্ষত এখনো পুড়ো মরক্কো দলকে তাতিয়ে রাখছে।
বিশ্বকাপে মরক্কোর ম্যাচ সূচি
উত্তর আমেরিকার গ্রুপ পর্বে মরক্কোকে লড়তে হবে তিনটি ভিন্ন মহাদেশীয় শক্তির বিরুদ্ধে। এবারের বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপে পড়েছে মরক্কো। যেখানে তাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজলি। সূচি অনুযায়ী, ১৩ মে নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে মরক্কো। ১৯ জুন বোস্টন স্টেডিয়ামে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবে দ্বিতীয় ম্যাচ। এরপর ২৪ জুন আটলান্টা স্টেডিয়ামে হাইতির বিপক্ষে খেলবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ।
পজিশনভিত্তিক ডেপথ অ্যানালাইসিস
কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি কাতারের সেই ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল দলের মূল নয়জন অভিজ্ঞ ফুটবলারকে ধরে রেখেছেন। তাদের সঙ্গে যোগ করেছেন একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ তুর্কিকে।
কাতারের পেনাল্টি শুটআউটের নায়ক এবং আল-হিলালের বিশ্বস্ত দেয়াল ইয়াসিন বুনুই থাকছেন পোস্টের নিচে এক নম্বর প্রহরী। তার অভিজ্ঞতা ও বড় ম্যাচের স্নায়ু ধরে রাখার ক্ষমতা মরক্কোর ডিফেন্সের মূল ভরসা।
পিএসজির ডান প্রান্ত দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ঝড় তোলা আশরাফ হাকিমি এই দলের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাঁর সঙ্গে নায়েফ আগুয়ের্ডের সেন্ট্রাল ডিফেন্স জুটির বোঝাপড়া মরক্কোর রক্ষণভাগকে যেকোনো পরাশক্তির সামনে দেয়াল তৈরি করতে সাহায্য করবে।
মাঝমাঠের ইঞ্জিন হিসেবে থাকছেন সোফিয়ান আমরাবাত, যিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণ মাঝপথেই ধ্বংস করতে সিদ্ধহস্ত। আক্রমণভাগে থাকছেন আইয়ুব এল কাবি। এছাড়া লিলের ১৮ বছর বয়সী বিস্ময়বালক মিডফিল্ডার আইয়ুব বাউআদ্দির অন্তর্ভুক্তি এই স্কোয়াডে নতুন এক্স-ফ্যাক্টর যোগ করেছে।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
স্কোয়াডে বুনু, হাকিমি ও আমরাবাতের মতো আন্তর্জাতিক তারকাদের পাশাপাশি অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বজয়ী তরুণদের শক্তি রয়েছে। হাকিমি এবং উইঙ্গারদের গতিশীল ওভারল্যাপের কারণে মরক্কো যেকোনো মুহূর্তে রক্ষণ থেকে আক্রমণে রূপান্তর হতে পারে।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে নতুন কোচ আসায়, তার ট্যাকটিকস ও খেলার ধরণ সিনিয়র দলের সঙ্গে শতভাগ খাপ খাইয়ে নিতে খেলোয়াড়দের কিছুটা বেগ পেতে হতে পারে।
এছাড়া কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো মূলত লো-ব্লক ডিফেন্স কৌশল নিয়ে সফল হয়েছিল। কিন্তু ব্রাজিল বা স্কটল্যান্ডের মতো আক্রমণাত্মক দলের বিপক্ষে যদি তারা গোল হজম করে বসে, তবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের কিছুটা দুর্বলতা প্রকাশ পেতে পারে।
মরক্কোর বিশ্বকাপ জার্নি
মরক্কোর বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে আফ্রিকান মহাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে। যদিও সেই বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলো-ছায়া
নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির কাছে ২-১ গোলে হারের পর বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে ১-১ গোলে ড্র করে মাথা উঁচু করেই দেশে ফিরেছিল মরক্কো।
এর ঠিক ১৬ বছর পর, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে আজিজ বুদেরবালার নেতৃত্বে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে গ্রুপের শীর্ষে থেকে নকআউট পর্বে ওঠার ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো। তবে শেষ ১৬-র লড়াইয়ে লোথার ম্যাথুসের ৮৮ মিনিটের দূরপাল্লার ফ্রি-কিক ট্র্যাজেডিতে পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের।
স্মরণীয় রেকর্ডসমূহ
সর্বোচ্চ গোলদাতা : ৩টি গোল নিয়ে বিশ্বমঞ্চে মরক্কোর সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ইউসেফ এন-নেসিরি। কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য ২.৭৮ মিটার উঁচুতে লাফিয়ে করা তার সেই হেডারটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আইকনিক মুহূর্ত।
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ : আশরাফ হাকিমি এবং হাকিম জিয়েচ প্রত্যেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে ১০টি করে ম্যাচ খেলেছেন, যা সামগ্রিকভাবে সমস্ত আরব দেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে যৌথ রেকর্ড।
দ্রুততম গোল : কাতার বিশ্বকাপে কানাডার বিপক্ষে ম্যাচের মাত্র ৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে বিশ্বমঞ্চে কোনো আরব দেশের হয়ে দ্রুততম গোলের রেকর্ড বইয়ে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন হাকিম জিয়েচ।
সবচেয়ে বড় জয় : ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচটি এখনো বিশ্বকাপে মরক্কোর সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়ের রেকর্ড।
২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য
মোহাম্মদ ওয়াহবির এই নতুন মরক্কো দলটি নিয়ে প্রত্যাশার পারদ এখন আকাশচুম্বী। কাতার ২০২২-এর চতুর্থ স্থান অর্জন যে কোনো ফ্ল্যাশ ইন দ্য প্যান ছিল না, তা প্রমাণ করার মোক্ষম সুযোগ এখন হাকিমি-বুনুদের সামনে। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মাটিতে অ্যাটলাস লায়ন্সরদের লক্ষ্য আবারও নতুন ইতিহাস লেখা।
মরক্কোর বিশ্বকাপ দল
গোলরক্ষক : ইয়াসিন বুনো, মুনির এল কাজুই ও রেদা তাগনাউতি।
ডিফেন্ডার : নুসাইর মাজরাউই, আনাস সালাহ-এদ্দিন, ইউসুফ বেল্লামারি, আশরাফ হাকিমি, জাকারিয়া এল ওউয়াহদি, নায়েফ আগের্ড, ছাদি রিয়াদ, রেদোয়ান হালহাল ও ইসা দিয়প।
মিডফিল্ডার : সামির এল মুরাবেত, আয়্যুব বাউআদ্দি, নীল এল আয়নাউই, সোফিয়ান আমরাবাত, আজ়েদ্দিন ওউনাহি, বিলাল এল খাননুস এবং ইসমাইল সাবিরি।
ফরোয়ার্ড : আবদে এজ়ালজুলি, ছেমসদিন তালবি, সুফিয়ান রহিমি, আয়ুব এল কাবি, ব্রাহিম দিয়াজ, গেসিম ইয়াসিন এবং আয়ুব আমাইমুনি।

ক্রীড়া প্রতিবেদক