রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ মিশন, সতীর্থরা চায় রঙিন করতে
রক্ষণভাগে রুবেন দিয়াসের নিরেট দেয়াল, মাঝমাঠে ব্রুনো ফার্নান্দেস ও বার্নার্দো সিলভার সৃষ্টিশীল জাদু, আর আক্রমণভাগে ৪১ বছর বয়সী চিরতরুণ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গোল করার সহজাত প্রবৃত্তি—সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগাল পা রাখছে বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী দল হিসেবে।
রবের্তো মার্তিনেসের আক্রমণাত্মক দর্শনে উজ্জীবিত এই দলটিতে যেমন রয়েছে অভিজ্ঞতার পাহাড়, তেমনি রয়েছে বর্তমান ক্লাব ফুটবলের সেরা পারফর্মারদের ছড়াছড়ি। ১৯৬৬ সালে ইউসেবিওর সেই ঐতিহাসিক তৃতীয় স্থান অর্জনের স্মৃতিকে ছাপিয়ে, রোনালদোর ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব আর দলীয় সংহতির মেলবন্ধনে এবার প্রথমবার সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার লক্ষ্যে বিশ্বমঞ্চে নামবে পর্তুগিজরা।
ডাগআউটের স্প্যানিশ মাস্টারমাইন্ড রবের্তো মার্তিনেস
বেলজিয়াম জাতীয় দলের ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’কে দীর্ঘ মেয়াদে কোচিং করিয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ানো স্প্যানিশ কোচ রবের্তো মার্তিনেস এখন পর্তুগালের ডাগআউটে। বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি দ্রুত আক্রমণে ওঠার এক চমৎকার পজিশনাল ফুটবল খেলার স্টাইলের জন্য তিনি সুপরিচিত।
তারকাখচিত স্কোয়াড থেকে সেরাটা বের করে আনার ক্ষেত্রে মার্তিনেসের ওপর পর্তুগিজ ফেডারেশনের আস্থা ইতোমধ্যেই প্রতিদান পেয়েছে, যখন ২০২৫ সালে তার অধীনেই পর্তুগাল উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জয় করে। বর্তমান পর্তুগাল দলেও ব্যক্তিগত প্রতিভার কোনো অভাব নেই। আর মার্তিনেসের লক্ষ্য এই প্রতিভাকে বৈশ্বিক মুকুটে রূপান্তর করা।
আর্মেনিয়াকে ৯-১ গোলে বিধ্বস্ত করে মূল মঞ্চে পর্তুগাল
ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাইপর্বের একদম শেষ ম্যাচডে-তে এসে বিশ্বমঞ্চের টিকিট নিশ্চিত করে পর্তুগাল। নিজেদের শেষ ম্যাচে আর্মেনিয়াকে ৯-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে তারা ‘গ্রুপ এফ’-এর শীর্ষ স্থান নিশ্চিত করে। এই বিশাল জয়ের ফলে হাঙ্গেরি এবং রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডকে ইউরোপীয় প্লে-অফের টিকিটের জন্য লড়াইয়ে নামতে হয়।
বাছাইপর্বের এই যাত্রায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের প্রাথমিক বাছাই পর্বের ইতিহাসের এককভাবে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার নতুন রেকর্ড গড়েন করেন।
বিশ্বকাপে পর্তুগালের সময়সূচি
গ্রুপ পর্বে খুব একটা চ্যালেঞ্জ নিতে হবে না পর্তুগালকে। বিশ্বকাপ মিশনের শুরুটাই পর্তুগালের জন্য অনেক আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেবে। কারণ ১৭ জুন হিউস্টন স্টেডিয়ামে তারা মুখোমুখি বিশ্বকাপের নবাগত দল কঙ্গোর বিপক্ষে। ২৩ জুন দ্বিতীয় ম্যাচে একই মাঠে তাদের প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান। ২৭ জুন মায়ামি স্টেডিয়ামে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করবে পর্তুগাল।
পজিশনভিত্তিক স্কোয়াড অ্যানালাইসিস
রবের্তো মার্তিনেসের ঘোষিত এই স্কোয়াডে যেমন রয়েছে অভিজ্ঞতার ঝুলি, তেমনি রয়েছে তারুণ্যের গতি। তবে বিস্ময়করভাবে টটেনহ্যামের জোয়াও পালহিনহা কিংবা বেনফিকার ডিফেন্ডার আন্তোনিও সিলভার এই স্কোয়াডে জায়গা হয়নি।
পোর্তোর নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক ডিয়োগো কস্তাই থাকছেন পোস্টের নিচে প্রথম পছন্দ। বড় ম্যাচে পেনাল্টি সেভ করার দক্ষতা এবং ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে কস্তার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছে দল।
ম্যানচেস্টার সিটির রক্ষণের স্তম্ভ রুবেন দিয়াস সেন্ট্রাল ডিফেন্সের নেতৃত্ব দেবেন। উইং-ব্যাকে জোয়াও কানসেলো এবং পিএসজির নুনো মেন্দেসের উপস্থিতি ডিফেন্সকে যেমন নিরেট করেছে, তেমনি আক্রমণেও যোগ করবে বাড়তি ধার।
ব্রুনো ফার্নান্দেসের দূরপাল্লার শট ও পাসিং এবং বার্নার্দো সিলভার অসাধারণ ড্রিবলিং ও বল হোল্ডিং ক্ষমতা পর্তুগালের মাঝমাঠকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিয়েটিভ হাব বানিয়েছে। তরুণ জোয়াও নেভেস এবং ভিতিনহার উপস্থিতি পর্তুগালের মাঝমাঠকে পূর্ণতা দেবে।
৪১ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ আসরে অংশ নিতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২২৬ ম্যাচে ১৪৩ গোলের বিশ্ব রেকর্ডের মালিক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তার সঙ্গে এসি মিলানের গতিদানব রাফায়েল লেয়াও, জোয়াও ফেলিক্স ও পিএসজির গনসালো রামোসের অন্তর্ভুক্তি পর্তুগালের আক্রমণভাগকে যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য এক দুঃস্বপ্ন করে তুলেছে।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
৪১ বছর বয়সেও রোনালদোর গোল করার ক্ষুধা এবং বড় মঞ্চে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা পর্তুগালের সবচেয়ে বড় শক্তি। একই সঙ্গে প্রতিটি পজিশনেই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলোতে খেলা বিশ্বখ্যাত বিকল্প ফুটবলার রয়েছে। যা মার্তিনেসকে ট্যাকটিক্যাল বৈচিত্র্য আনার দারুণ স্বাধীনতা দেবে।
মাঝমাঠ থেকে ব্রুনো ফার্নান্দেস ও বার্নার্দো সিলভার যুগলবন্দি প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার জন্য নিখুঁত পাস ও সুযোগ তৈরি করতে অনন্য।
জোয়াও পালহিনহা স্কোয়াডে না থাকায় কাউন্টার অ্যাটাক ডিফেন্ড করার সময় মাঝমাঠে একজন প্রথাগত ফিজিক্যাল ডেস্ট্রয়ারের অভাব বোধ হতে পারে রোনালদোদের জন্য। একই সঙ্গে কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে শেষ আটে হেরে বিদায় নেওয়ার পর, এবার শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়ে শিরোপা জয়ের যে আকাশচুম্বী চাপ রয়েছে, তা সামলানো বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক আসরেই কিংবদন্তি ইউসেবিও এবং মারিও কোলুনার নেতৃত্বে তৃতীয় স্থান অর্জন করে ইতিহাস গড়েছিল পর্তুগাল। গ্রুপ পর্বে পেলের ব্রাজিলকে পরাজিত করে বিশ্বকে চমকে দেওয়া সেই আসরটি আজও দেশের ফুটবলের সোনালী অতীত।
এরপর ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপেও তারা সেমিফাইনালে উঠেছিল, যেখানে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে রোমাঞ্চকর জয় এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে গোলরক্ষক রিকার্ডোর অবিশ্বাস্য সেভের স্মৃতি আজও অম্লান। ২০০২ সাল থেকে টানা ৭ বারসহ মোট ৯ বার বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে তারা।
স্মরণীয় যত রেকর্ড
সর্বোচ্চ গোলদাতা : ১৯৬৬ সালের এক আসরেই ৯টি গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছিলেন কিংবদন্তি ইউসেবিও। যিনি পর্তুগালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ : দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে খেলা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বিশ্বমঞ্চে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ২২টি ম্যাচ খেলেছেন। যা এই আসরে আরও বৃদ্ধি পাবে।
সবচেয়ে বড় জয় : ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে উত্তর কোরিয়াকে ৭-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছিল পর্তুগাল। যেখানে তিয়াগো জোড়া গোল এবং রোনালদোসহ পাঁচজন ভিন্ন খেলোয়াড় একটি করে গোল করেছিলেন। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ৬-১ গোলে গুঁড়িয়ে দেওয়া ম্যাচটিও তাদের অন্যতম বড় জয়।
২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের লক্ষ্য
রবের্তো মার্তিনেসের অধীনে এই পর্তুগাল দলটির ট্রফি জয়ের সব ধরনের যোগ্যতা ও সামর্থ্য রয়েছে। গুঞ্জন আছে, এবারই ফুটবলের রাজপুত্র ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বমঞ্চের অভিযান। শেষ বেলায় উত্তর আমেরিকার মাটিতে একটি ট্রফি জিতে নিজের সব অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেওয়ার লক্ষ্য থাকবে রোনালদোর। বাকিরাও চাইবেন প্রিয় সতীর্থের বিদায়কে রঙিন করে তুলতে।
পর্তুগালের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার : ডিয়োগো কস্তা, জোসে সা, রুই সিলভা, রিকার্ডো ভেলহো
ডিফেন্ডার : দিওগো দালোত, নেলসন সেমেদো, জোয়াও কানসেলো, নুনো মেন্দেস, গনসালো ইনাসিও, রেনাতো ভেইগা, রুবেন দিয়াস, টমাস আরাউজো, ও ম্যাথিউস নুনেস।
মিডফিল্ডার : ব্রুনো ফার্নান্দেস, বার্নার্দো সিলভা, ভিতিনহা, জোয়াও নেভেস, রুবেন নেভেস ও সামুয়েল কস্তা।
ফরোয়ার্ড : ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, জোয়াও ফেলিক্স, রাফায়েল লেয়াও, গনসালো রামোস, পেদ্রো নেতো, ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও, গনসালো গেদেস ও ফ্রান্সিসকো ট্রিনকাও।

ক্রীড়া প্রতিবেদক