আর্জেন্টিনার কাছে প্রতিটি ম্যাচ উৎসবের মতো
প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে কৌশল সাজানো নতুন কিছু নয়। এটিই বরং ফুটবলের আদি ও অকৃত্রিম পদ্ধতি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আর্জেন্টিনার খেলা দেখলে অবশ্য দ্বিধায় পড়তে হবে। আলবিসেলেস্তেরা আদৌ প্রতিপক্ষকে নিয়ে ভাবে কি না, সেটি ভাবতে ভাবতেই অনেকের সময় যায়।
না ভেবে উপায় কী! লিওনেল মেসি, লাউতারো মার্টিনেজ, রদ্রিগো ডি পলদের খেলা দেখলে মনে হবে, তারা নিজেরা খেলছেন। মাঠে আরও ১১ জন আছেন বিপক্ষ দলে, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই লিওনেল স্কালোনির শিষ্যদের। তারা ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। এটিই তাদের আলাদা করেছে অন্যদের চেয়ে।
কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকেই বলা হচ্ছিল, নির্ভার হয়ে খেলছে আর্জেন্টিনা। এতটাই যে, প্রতিটি ম্যাচ তাদের কাছে উৎসবের মতো। ম্যাচ জয়ের মতো সবচেয়ে কঠিন কাজটিকেই তারা করে ফেলেছে সবচেয়ে সহজ।
ম্যাচ ভেদে বদলে যায় কৌশল, বদলে যায় খেলার ধরন। কিন্তু, চলমান বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যেন একেবারেই ভিন্ন পথে হাঁটছে। প্রতিপক্ষ কে, সেটি যেন খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয় তাদের কাছে। নিজেদের ছন্দ, নিজেদের পরিকল্পনা আর নিজেদের ফুটবলই খেলছে দলটি। যে কারণে আলবিসেলেস্তেদের থামানো এখন বিশ্বের সেরা দলগুলোর জন্যও কঠিন হয়ে উঠেছে।
গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা ছিল ‘প্রায়’ অপ্রতিরোধ্য। প্রায় বলার কারণ, শেষ ম্যাচে একটি গোল তারা হজম করেছে। তাতে যদিও আকাশী-নীলদের বীরত্বে কোনো হেরফের হয়নি।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল উৎসবে মেসির হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তার জোড়া গোল এবং জর্ডানের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিকে গোল। প্রতিটি ম্যাচেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ রেখেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। শুধু জয় নয়, যেভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেটিই সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে ফুটবল বিশ্লেষকদের।
দলের সবচেয়ে বড় শক্তি মেসি। মেসিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আর্জেন্টিনার একেকটি আক্রমণ, এটি এখন আর গোপন কিছু নয়। প্রশ্ন উঠেছিল, তাকে ছাড়া দল কতটা কী করতে পারে। সেটিও তারা দেখিয়েছে জর্ডানের বিপক্ষে। মেসিকে ছাড়াই দুই গোল দিয়েছে লো সেলসো ও মার্টিনেজ।
আর্জেন্টিনা এখন এমন এক ইউনিট, যেখানে প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করছে। মাঝমাঠে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ ও রদ্রিগো ডি পলের নিয়ন্ত্রণ, সামনে হুলিয়ান আলভারেজদের গতিময়তা এবং রক্ষণে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোদের দৃঢ়তা দলটিকে দিয়েছে অসাধারণ ভারসাম্য।
তবু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছেন মেসিই। বয়স ৩৯ পার হলেও মাঠে তার প্রভাব একটুও কমেনি। জর্ডানের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে ফ্রি কিক থেকে গোল করে বিশ্বকাপে টানা সাত ম্যাচে গোল করার অনন্য বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। আগের ম্যাচে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
আর্জেন্টিনাকে ভয়ংকর করে তুলেছে তাদের দলীয় বোঝাপড়া। সবাই সারা মাঠজুড়ে ভূমিকা রাখেন। ফলে প্রতিপক্ষের জন্য নির্দিষ্ট একজনকে আটকে রাখার পরিকল্পনা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
বল হারানোর পর দ্রুত তা পুনরুদ্ধার করা, মুহূর্তের মধ্যে রক্ষণ থেকে আক্রমণে চলে যাওয়া এবং পুরো ম্যাচজুড়ে একই তীব্রতা ধরে রাখার সক্ষমতাও স্কালোনির দলের বড় অস্ত্র। আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে অসাধারণভাবে কাজে লাগাচ্ছে আর্জেন্টিনা।
সামনে নকআউট পর্ব শুরু। সেখানে ভুলের সুযোগ নেই। তবু বর্তমান ফর্ম, আত্মবিশ্বাস, দলীয় সমন্বয় ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদার আর্জেন্টিনা। নকআউটের প্রথম ধাপে (রাউন্ড অব ৩২) প্রতিপক্ষ নবাগত কেপ ভার্দে। যেখানে স্পষ্ট ফেভারিট আর্জেন্টিনা।
প্রতিপক্ষ নিয়ে তারা অবশ্য খুব একটা ভাবছে না। কারণ স্কালোনির দলের বিশ্বাস, নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলে যে কোনো প্রতিপক্ষকে হারানো সম্ভব। ফুটবল দুনিয়ায় তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— নির্ভার এই আর্জেন্টিনাকে থামানোর সাধ্য কার?

স্পোর্টস ডেস্ক