মায়ের আত্মত্যাগে গড়ে ওঠা এক ফুটবল তারকার গল্প
ফুটবলের মাঠে সব নায়ক আলোয় থাকেন না। কেউ গোল করেন, কেউ ট্রফি জেতার মুহূর্তে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান, আবার কেউ নিঃশব্দে পুরো দলের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে যাযন। ফাবিয়ান রুইজ সেই দ্বিতীয় ধরনের ফুটবলার। যার উপস্থিতি অনেক সময় চোখে পড়ে না। কিন্তু তার অনুপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মাঠে যেন এক অদৃশ্য শিল্পী, যিনি সঠিক মুহূর্তে সঠিক জায়গায় পৌঁছে খেলার গল্প বদলে দেন। নিখুঁত পাস, অসাধারণ দূরদৃষ্টি আর নীরব পরিশ্রমে ফাবিয়ান আজ স্পেনের মাঝমাঠের এমন এক শক্তি, যাকে ছাড়া দলের ভারসাম্য কল্পনা করা কঠিন।
ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পের প্রথম স্পর্শ ছিল দেখার মতো। ফরাসি তারকা শরীর ঘুরিয়ে বল নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন হাজির হলেন ফাবিয়ান রুইজ। মুহূর্তের মধ্যে তিনি এমবাপ্পের কাছ থেকে বল কেড়ে নিলেন এবং সম্ভাব্য বিপদ থামিয়ে দিলেন। কয়েক সেকেন্ড আগেও তিনি ছিলেন অন্য প্রান্তে, কিন্তু তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুঝে নিয়েছিল কোথায় বিপদ তৈরি হতে পারে। এটাই ফাবিয়ানের বিশেষত্ব, তিনি এমন জায়গায় পৌঁছে যান, যেখানে তার থাকার কথা নয়।
লামিনে ইয়ামালের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার মুহূর্তেও দেখা গেছে তার অসাধারণ মাঠের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা। তিনি বুঝেছিলেন ডান প্রান্তে পেদ্রো পোরো ফাঁকা অবস্থায় আছেন এবং এমবাপ্পে সেই জায়গা ব্যবহার করতে পারেন। পরিস্থিতি বোঝার এই দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা আগেই আঁচ করতে পারাই তাকে কোচের অন্যতম প্রিয় খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে জানেন, বড় ম্যাচে শুধু প্রতিভা নয়, প্রয়োজন ভারসাম্য ও বুদ্ধিমত্তার। পেদ্রির মতো সৃজনশীল মিডফিল্ডার থাকলেও ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ফাবিয়ানকে। কারণ ফাবিয়ান একসঙ্গে রক্ষণ সামলাতে পারেন, আক্রমণ তৈরি করতে পারেন এবং দ্রুতগতির পাসিং ফুটবলে দলের ছন্দ ধরে রাখতে পারেন। তিনি যেন মাঠের এক গোপন কৌশলী, নীরবে প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভেঙে দেন এবং সুযোগ পেলেই আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দেন।
ফাবিয়ানের মূল্য বোঝার জন্য শুধু গোল বা অ্যাসিস্টের দিকে তাকালে হবে না। ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি দুটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। তার পাস সফলতার হার ছিল ৮৮ শতাংশ, পাশাপাশি করেছিলেন ২৪টি সফল ট্যাকল এবং ২১ বার বল পুনরুদ্ধার। বিশ্বকাপেও সীমিত সময় মাঠে থেকেও তিনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোল করেন, পাঁচটি সুযোগ তৈরি করেন এবং তার পাস সফলতার হার ছিল ৯২.৫ শতাংশ। তবে তার আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে সেই সব মুহূর্তে, যেগুলো সাধারণ পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
এই অসাধারণ ফুটবলারের পেছনে রয়েছে কঠিন সংগ্রামের গল্প। মাত্র ১২ বছর বয়সে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর তার মা একাই তিন সন্তানকে বড় করেন। সেভিলের ছোট শহর লস পালাসিওস ই ভিয়াফ্রাঙ্কায় তার মা সংসার, পড়াশোনা এবং ফাবিয়ানের ফুটবল প্রশিক্ষণের দায়িত্ব এক হাতে সামলান। এমনকি রিয়াল বেতিসের যুব দলে খেলার সময় তার মা সেই ক্লাবেই ড্রেসিংরুম পরিষ্কারের কাজ করতেন। ছোটবেলায় যে বিষয়টি ফাবিয়ানের কাছে অস্বস্তিকর ছিল। বড় হয়ে সেটিই তার কাছে মায়ের ভালোবাসা ও ত্যাগের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে।
আজ ফাবিয়ান রুইজ বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারদের একজন হিসেবে স্বীকৃত। তিনি হয়তো সবসময় শিরোনামে থাকেন না, কিন্তু বড় ম্যাচে তাঁর উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর ফুটবল শেখায়, সব নায়ককে আলোয় থাকতে হয় না। কিছু নায়ক নীরবে কাজ করেন, ছায়ার আড়ালে থেকে দলকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের ছাপ রেখে যান।

স্পোর্টস ডেস্ক