ব্যালন ডি’অর জয়ে কার সম্ভাবনা কত শতাংশ?
ফুটবলে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর। প্রতি মৌসুমের সেরা খেলোয়াড়কে দেওয়া হয় এই পুরস্কার। ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট থেকে ১৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে প্রদান করা হবে এবারের ব্যালন ডি’অর। ইতোমধ্যে ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে।
সেরা এই সম্মানজনক পুরস্কারের ক্ষেত্রে বরাবরই ক্লাব মৌসুমের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বড় ভূমিকা রেখে এসেছে বিশ্বকাপ। তবে এবার এখানেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ধোঁয়াশা ও জট!
পরিস্থিতি বলছে, ক্লাব ফুটবলে যারা পুরো মৌসুম জুড়ে দ্যুতি ছড়িয়েছেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চ বা বিশ্বকাপে তারা ছিলেন খানিকটা ফিকে। আবার উল্টো চিত্রও রয়েছে—যারা বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়েছেন, ক্লাব ফুটবলে তাদের পারফরম্যান্স ছিল কিছুটা নিম্নমুখী।
এর বাইরে ১০০ জন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাংবাদিকের ভোট এই ব্যালন ডি’অর বিজয়ী নির্ধারণে সবচেয়ে বড় প্রভাব রাখবে। তাদের দেওয়া পয়েন্টের ওপরই নির্ভর করছে কার হাতে উঠবে বছরের সেরা ফুটবলারের কাঙ্ক্ষিত এই ট্রফি।
চলতি মৌসুমে ব্যালন জয়ের দৌড়ে কার পাল্লা ঠিক কতটা ভারী, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
শুরুতেই বলা যাক কিলিয়ান এমবাপ্পের কথা। রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে ফরাসি এই তারকার চুক্তিতে ব্যালন ডি’অর জিতলে ১ কোটি ৫০ লাখ ইউরো বোনাস পাওয়ার শর্ত রয়েছে। তাই প্রকাশ্যে নিজের পক্ষে প্রচার চালাতে দেখা গেছে তাকে। যা নিয়ে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই।
কারণ এমবাপ্পের দাবির পক্ষে দারুণ কিছু পরিসংখ্যানও রয়েছে। গত মৌসুমে রিয়ালের জার্সিতে ৪৪ ম্যাচে ৪২ গোল করার পাশাপাশি ৭টি গোলে সহায়তা করেছেন এমবাপ্পে। এর সঙ্গে বিশ্বকাপ এবং তার আগের আন্তর্জাতিক বিরতিগুলোতে ফ্রান্সের জার্সিতে তিনি করেছেন আরও ১৬ গোল। সব মিলিয়ে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৫৮টিতে, যা ইউরোপের ফুটবলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ—ম্যানচেস্টার সিটি ও নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হাল্যান্ডের ঠিক সমান।
রিয়ালের প্রায় সব বড় ম্যাচেই নিজের নামের প্রতি সুবিচার করেছেন এমবাপ্পে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে দুই লেগেই গোল করার পাশাপাশি লা লিগায় বার্সেলোনা ও অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষেই জালের দেখা পেয়েছেন। ফলে দুই প্রতিযোগিতাতেই সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। তবে এটাও সত্যি যে, নিজের গোলসংখ্যা বাড়ানোর দিকে একটু বেশিই মনোযোগী ছিলেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।
পেছনে ফিরে রক্ষণভাগে সহায়তা করার ক্ষেত্রে তার অনীহার কারণে আক্রমণে ওঠার সময় প্রায়ই বিপদে পড়তে হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদকে। এছাড়া নিজের পছন্দের বাঁ দিক থেকে ভেতরে সরে আসার কারণে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের জায়গা দখল করায় পেনাল্টি বক্সের ভেতর অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো নাম্বার নাইন বা স্ট্রাইকার পায়নি রিয়াল।
অন্যদিকে, ফ্রান্স দলে এমবাপ্পে যতটা না প্রভাব ফেলতে পেরেছেন, তার চেয়েও অনেক বেশি কার্যকরী ছিলেন লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার জন্য। আর এই একক ম্যাজিকই তাকে ক্যারিয়ারে এনে দিয়েছে রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর। এমনকি ফুটবলে কারও কারও মতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই এই পুরস্কারটি মেসির পাওয়া উচিত ছিল। কারণ মাঠে এই আর্জেন্টাইন জাদুকরের সামগ্রিক প্রভাবের ধারে কাছেও কেউ আসতে পারেননি।
আগামী মাসে যদি মেসি নিজের রেকর্ড আরও বাড়িয়ে নবম বারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতে নেন, তবে সেটি বিশ্ব ফুটবলে বেশ বড় এক চমক হিসেবেই আসবে। কারণ, ইউরোপের বাইরে মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলাটা ভোটদাতাদের বিচারে তাঁকে খানিকটা পিছিয়ে রাখবে।
এই সময়ের মধ্যে মায়ামির জার্সিতে মাত্র ৩০ ম্যাচে মেসির ৫২ গোল ও অ্যাসিস্টের অবিশ্বাস্য সম্মিলিত পরিসংখ্যান হয়তো খুব একটা পাত্তা পাবে না। কারণ, আমেরিকান লিগকে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের (প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা, বুন্দেসলিগা, সিরি আ ও লিগ ওয়ান) চেয়ে কম মানের মনে করা হয়।
তবে কাতার বিশ্বকাপের মতো আসরে মেসি আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনি এখনও শীর্ষ পর্যায়ে কতটা ভয়ংকর। রদ্রি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতলেও অনেকেই মনে করেন সেটি আর্জেন্টাইন অধিনায়কেরই পাওয়া উচিত ছিল। কারণ দলকে তিনি প্রায় একা হাতে টানা দ্বিতীয় ফাইনালে তুলেছিলেন।
বিশ্বকাপে মেসির করা আটটি গোলের মধ্যে অন্তত তিনটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মিশরের বিপক্ষে সমতাসূচক গোল কিংবা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় অর্ধে তার পারফরম্যান্স ছিল মন্ত্রমুগ্ধকর।
মেসির বয়স এখন ৩৯ হলেও এমবাপ্পের সামগ্রিক খেলা তার সঙ্গে তুলনাই চলে না। এমবাপ্পেকে ছাড়াই ফ্রান্স হয়তো সেমিফাইনালে উঠতে পারত, কিন্তু মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনা দলটা পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়ত।
এ ছাড়াও গোলের হিসাব বাদ দিলে হ্যারি কেইনও অনেক দিক থেকে এমবাপ্পের চেয়ে এগিয়ে আছেন। বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ডের এই পরীক্ষিত স্ট্রাইকার কেবল গোলই করেন না, বরং আক্রমণ তৈরির কাজেও সমানভাবে সক্রিয় থাকেন এবং নানা উপায়ে প্রতিপক্ষ রক্ষণকে ভাঙার ক্ষমতা রাখেন।
বিপরীতে এমবাপ্পে তার চোখের পলক ফেলা গতির ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। রক্ষণভাগের পেছনে ফাঁকা জায়গায় দৌড়ানোর ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। তবে নিচে নেমে খেলা জমাট রক্ষণগুলোর বিপক্ষে বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে শট নেওয়ার চেনা কৌশলটি ভালো দলগুলো এখন সহজেই আটকে দিতে পারে।
এদিকে গতবারের ব্যালন জয়ী উসমান দেম্বেলে পিএসজির জার্সিতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লিগ ওয়ান ও সুপার কাপসহ সম্ভাব্য প্রায় সব ট্রফিই জিতেছেন। নকআউট পর্বেও দারুণ ফর্মে ছিলেন তিনি। বিশ্বকাপে ৬টি গোল করলেও গুরুত্বপূর্ণ নকআউট পর্বে নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি।
সব মিলিয়ে এবারের লড়াইয়ে কার হাতে উঠবে কাঙ্ক্ষিত এই সোনালী ট্রফি, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই।

স্পোর্টস ডেস্ক