ষাট গম্বুজের ছায়ায় একদিন
সকালের সোনালি আলো ঠিক যেন লাল-খয়েরি ইটের গায়ে রঙ তুলির মতো আঁচড় কাটছে। দূর থেকে চোখে পড়ে বিশাল এক স্থাপনা এটাই বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ। বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক, যা ১৫শ শতকে খান জাহান আলী নির্মাণ করেছিলেন।
ষাট গম্বুজ নাম হলেও এ মসজিদের গম্বুজ আসলে ৬০টি নয়। রয়েছে ৮১টি গম্বুজ। সাত লাইনে ১১ টি করে ৭৭ টি এবং চার কোনায় ৪ টি মোট ৮১ টি। কালের বিবর্তনে লোকমুখে ৬০ গম্বুজ বলতে বলতে ষাট গম্বুজ নামকরণ হয়ে যায়, সেই থেকে ষাট গম্বুজ নামে পরিচিত।
মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাহিরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় ৮·৫ ফুট পুরু। এছাড়া মসজিদের ভেতরের দেওয়ালে ১০টি মেহরাব রয়েছে।
মসজিদটির পূর্ব দিকে ১১টি বিরাট আকারের খিলানযুক্ত দরজা আছে। মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে বড়। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে আরও ৭টি করে দরজা। মসজিদের চার কোণে রয়েছে চারটি করে মিনার।
মসজিদের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে এক অদ্ভুত শীতল অন্ধকার, আর ছড়িয়ে থাকা বিশাল পাথরের স্তম্ভ। প্রতিটি স্তম্ভের উপরে গম্বুজের বাঁকানো শৈলী যেন মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি বগুড়া থেকে মসজিদটি দেখতে এসেছে দুই বন্ধু আব্দুর রাজ্জাক ও সিদ্দিক। তারা বলেন, “মসজিদটি ছবিতে অনেকবার দেখেছি। আজ সামনাসামনি দেখলাম। মসজিদটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, এ গম্বুজগুলো যেন নিঃশব্দে গল্প বলছে, শত বছরের ইতিহাসের গল্প। সত্যিই এখানে না আসলে অনেক কিছুই অজানা থাকতো।''
খুলনা মিলিটারি কলেজিয়েট স্কুল থেকে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী এসেছেন মসজিদটি ঘুরে দেখতে। তারা জানান, তারা শিক্ষা সফরে এসেছে।
এদের মধ্যে আবইয়াদ নামের এক শিক্ষার্থী জানান, এরকম মসজিদ আমি প্রথম দেখলাম। খুব ভালো লাগলো। আমাদের সাথে যারা আসেনি তারা দারুণ একটা স্থান মিস করলো'।
কথা হয় ষাট গম্বুজ মসজিদের ভারপ্রাপ্ত ইমাম ও খতিব মাওলানা নাসির উদ্দিনের সাথে। তিনি জানান, এ দেশে ইসলাম প্রচারের জন্য এসেছিলেন খান জাহান আলী। তিনি এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।
মাওলানা নাসির উদ্দিন আরও বলেন, 'প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী এখানে আসেন। কেউ কেউ ঘিরে চলে যান, আবার কেউ কেউ মসজিদে এসে নামাজ আদায় করেন।'
আরও যা দেখার রয়েছে
এখানে আসলে শুধু ষাট গম্বুজ মসজিদ নয়, মসজিদের কিছু দূরে খান জাহান আলীর মাজার আর “ঘোড়া দীঘি” রয়েছে। বিশেষ করে এই জায়গাগুলো স্থানীয় নানা কাহিনিতে ভরা। বলা হয়, দীঘির পানিতে নাকি এখনো বিশেষ ঔষধি গুণ আছে। সময় থাকলে এগুলোও ঘিরে দেখতে পারেন।
যা খাবেন
ঘোরাঘুরির শেষে পেটের দাবি মেটাতে বাগেরহাট শহরের রেস্টুরেন্টে ঢুঁ মারতে পারেন। তাজা ইলিশ ভাজা, গরম গরম ভাতের সঙ্গে সর্ষে ভর্তা, আর ডেজার্টে মিষ্টি দই এখানকার বিশেষত্ব।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে খুলনা বা বাগেরহাটগামী বাসে চড়ে ৬-৭ ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন বাগেরহাটে। জনপ্রতি বাস ভাড়া পরবে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যেই। সেখান থেকে রিকশা বা অটোতে ১৫-২০ মিনিটেই মসজিদে পৌঁছানো যায়। খুলনা থেকেও প্রতিদিন লোকাল পরিবহন চলে।
কিছু টিপস
১. এটি যেহেতু একটি মসজিদ, সক্রিয় নামাজের স্থান, তাই পোশাক-আচরণে শালীনতা বজায় রাখা জরুরি।
২. দুপুরের দিকে রোদ বেশি হয়, তাই সকাল বা বিকালে আসা ভালো।
৩. ছবি তুলতে ভুলবেন না, তবে মানুষের প্রার্থনা বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত ব্যাহত করবেন না।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত