পদ্মার চরে বিষাক্ত পোকা-সাপের উপদ্রব, তদন্ত কমিটি গঠন
পাবনার সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের চর সদিরাজপুরে দেখা দিয়েছে বিষধর সাপ ও পোকার আতঙ্ক। এরই মধ্যে বিষাক্ত পোকার কামড়ে মারা গেছেন এক ব্যক্তি, বিষধর সাপের দংশনে গুরুতর আহত আরেক ব্যক্তি রয়েছেন হাসপাতালে। আতঙ্কে চরের জমিতে চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়েছেন কেউ কেউ।
স্থানীয়রা জানায়, শুষ্ক মৌসুমে প্রতিবছরই পাবনার পদ্মার চরগুলোতে পেঁয়াজ, মশুর, মাসকলাই, সরিষাসহ রবিশস্য আবাদ করা হয়। কিন্তু চলতি বছর বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পরও সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নের চরসদিরাজপুর গ্রামের এই সুবিশাল চর এখনো অনাবাদী, ঝোপ জঙ্গলে ঠাসা।
কৃষকরা জানালেন, এ বছর উজান থেকে নেমে আসা পদ্মার পানিতে হঠাৎ বন্যায় তলিয়ে গিয়েছিল উপজেলার আড়াই হাজার বিঘা আয়তনের সবচেয়ে উঁচু এ চরটিও। পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকরা কাজে গিয়ে দেখতে পান নানা ধরনের অপরিচিত সাপ ও পোকামাকড়ের আনাগোনা। ফসল আবাদের জন্য জমির ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করতে গিয়ে সম্প্রতি বিষাক্ত পোকার কামড়ে মারা যান আফজাল কাজী (৫০) নামের এক ব্যক্তি। সাপের দংশনে গুরুতর আহত হয়ে নজরুল ইসলাম (৩৫) নামের আরেক কৃষক রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
পোকার কামড়ে মারা যাওয়া আফজাল কাজীর ছেলে শাহীন এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘বাবা নভেম্বর মাসের ১ তারিখ মাঠে কাজ করতে গেলে জঙ্গল পরিষ্কারের সময় তাঁকে কাঁকড়া বিছা পোকা কামড় দেয়। বিষক্রিয়ায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সপ্তাহখানেক আইসিইউয়ে থাকার পর মারা যান তিনি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বিষক্রিয়াতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।’
সরেজমিনে চরসদিরাজপুরে গিয়ে দেখা যায়, শুকিয়ে আসা শীর্ণ পদ্মায় ছোট নৌকায় পার হতে চরে যেতে হয়। পলি পড়া উর্বর চরের জমিতে ফসল ভালো হয়। কোনো বসতবাড়ি নেই। তবে গরু, মহিষ, ভেড়াসহ গবাদিপশুর বাথান রয়েছে স্থানীয়দের। উর্বর এ জমির ফসলের ওপর কয়েকশ পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল হলেও এখন আতঙ্কে চরে যেতেই ভয় পাচ্ছেন তারা।
দোগাছী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান হযরত আলী এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আগে কখনো এ ধরনের অপরিচিত সাপ, পোকার আনাগোনা দেখা যায়নি। এ বছর চরে কাজ করতে আসা অনেকেই বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও পোকা দেখেছেন। আমি নিজেও কয়েকটি জঙ্গল পরিষ্কারের সময় বেশ কিছু সাপ দেখেছি।’
আফজাল কাজীর মৃত্যুর পর চাষিদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আবাদ করতে আসতেই ভয় পাচ্ছেন চাষিরা। ফলে বিশাল এ চর এ বছর অনেকটাই অনাবাদি পড়ে আছে।
স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পাবনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জয়নাল আবেদীন, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহমুদুল ইসলাম, কৃষি কর্মকর্তা এস এম মাসুম বিল্লাহ, জেলা কীটতত্ত্ববিদ হেলাল উদ্দিনসহ উপজেলা প্রশাসনের আট সদস্যের তদন্ত কমিটি। বন্যার কারণে সাপ ও পোকার উপদ্রব এমন বেড়েছে বলে ধারণা তাঁদের।
জেলা কীটতত্ত্ববিদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘পোকার কামড়ে মারা যাওয়া আফজাল কাজীর পরিবারের বক্তব্য ও দেখানো ছবিতে মনে হচ্ছে তিনি স্করপিয়ন জাতীয় বিছা কাঁকড়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ধরনের পোকার বিষক্রিয়ায় মানুষের মৃত্যু হতে পারে।’
হেলাল উদ্দিন আরো বলেন, ‘উজান থেকে নেমে বন্যার পানিতে বিভিন্ন ধরনের পোকা ও সাপ উঁচু এই চরে আশ্রয় নিয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। তবে, নিশ্চিত হতে আরো পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।’
ইউএনও জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘পোকা ও সাপের উপদ্রবের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন অবগত রয়েছে। প্রয়োজনীয় উপকরণ ও ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। আতঙ্কিত না হয়ে স্থানীয়দের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিহত চাষি আফজাল কাজী ও আহত নজরুলের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে।’

এ বি এম ফজলুর রহমান, পাবনা