ঘুষের সীমা ১০০ টাকা থেকে ২০ লাখ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)জানিয়েছে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় জরিপকর্মী থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দুর্নীতিতে জড়িত। ভূমি সেবায় সব ধরনের কাজে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষের লেনদেন হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘ভূমি সেবায় দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভূমি খাতে ১৮ লাখ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে যা মোট মামলার ৬০ শতাংশ।’
আজ রোববার টিআইবির ধানমণ্ডির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সেবা কার্যক্রম : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের সাংর-সংক্ষেপ উপস্থাপনের সময় এসব তথ্য দেওয়া হয়।urgentPhoto
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচী ব্যবস্থাপক (সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার) মো. ওয়াহিদ আলম, উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক (ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার) নিহার রঞ্জন রায় এবং সহকারী কর্মসূচী ব্যবস্থাপক (অ্যাসিসটেন্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার) নাজমুল হুদা মিনা গবেষণার সার-সংক্ষেপ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপনির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অক্টোবর ২০১৪ থেকে জুলাই ২০১৫ মেয়াদে এ গবেষণা পরিচালিত হয়।
কর্মকর্তা থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ভূমি জরিপের সময় জরিপকর্মী কর্তৃক জমির পরিমাণ কম দেখানো ও খতিয়ানে ভুল তথ্য লেখার ভয় দেখিয়ে ভূমি মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ, ঘুষের বিনিময়ে খাস জমি, অর্পিত সম্পত্তি ও কোর্ট অব ওয়ার্ডসের সম্পত্তি দখলকারী ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীদের নামে রেকর্ড প্রস্তুত, তহসিল কার্যালয়ের মাধ্যমে ঘুষের বিনিময়ে নামজারি, কোনো কোনো ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অবৈধভাবে দখল করা খাসজমি, কোর্ট অব ওয়ার্ডসের এবং অর্পিত ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ক্ষমতাবান ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের অনুকূলে নামজারি, কৃষি খাস জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের প্রভাব ও স্বজনপ্রীতিসহ নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ আছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, ভূমি উন্নয়ন করের ক্ষেত্রে ১০০ থেকে ১০ হাজার টাকা, নামজারির ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা, রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে এক হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদান-প্রদান হয়। এ ব্যাপারে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘হাট-বাজার ইজারার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সেখানে আমরা দেখতে পাই ১০ হাজার টাকা থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষের লেনদেন হয়। এ ধরনের বিষয়গুলো খুবই প্রকট। অনিয়মের যে সার্বিক চিত্র সেখানে বলা বাহুল্য অন্যান্য খাতের চেয়ে বেশি এখানে।’
সুশাসন ও আনুষঙ্গিকের অভাব পরিষ্কার
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, কার্যকর প্রশিক্ষণের অভাব, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও রেকর্ড সংরক্ষণ, কার্যালয়ে ব্যবহৃত আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের ঘাটতি, ভূমি খাতে সীমিত ও সমন্বয়হীন ডিজিটালাইজেশন, মাঠপর্যায়ে ভূমি সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে নাগরিক সনদ ও তথ্য কর্মকর্তার অনুপস্থিতি, ভূমি সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তিতে দেওয়ানি আদালতের সীমাবদ্ধতাসহ বিদ্যমান বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের কারণে ভূমি খাতে সুশাসন মারাত্মকভাবে ব্যাহত ও অনিয়ম, দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ছে।
এ ব্যাপারে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এ খাতে গত পাঁচ বছরে সুশাসনের জন্য ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আরো অগ্রগতির প্রয়োজন রয়েছে। ভূমি সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগে যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ করা যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে দুর্বলতা আছে। ভূমি সংক্রান্ত মামলা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং এর পরিচালনায় রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও করের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুশাসনের ঘাটতি লক্ষ করা যায়। ভূমি সেবা নারীবান্ধব নয়, যা আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে।’
সংবাদ সম্মেলনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভূমি সংক্রান্ত সব প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো পরিচালনার জন্য একটি একক অধিদপ্তর গড়ে তোলাসহ ১২টি সুপারিশ করা হয়। জাতীয় বাজেটে ভূমি খাতের জন্য চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ রাখা, সমন্বিত ডিজিটালাইজেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, নিবন্ধন পরিদপ্তর ও দেওয়ানি আদালতে জনবল নিয়োগ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সেবার ওপর গণশুনানির আয়োজন, ভূমি মেলার আয়োজন, ভূমিহীন বিধবা নারীদের কৃষি খাস জমি পাওয়ার শর্ত হিসেবে সক্ষম পুত্র থাকার বাধ্যবাধকতার বিষয়টি রহিত করার সুপারিশ করা হয়।
আছে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত পাঁচ বছরে সরকার ভূমি খাতে একাধিক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। এরমধ্যে ডিজিটাল ভূমি জরিপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠায় গৃহিত পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা যার আওতায় সাতটি জেলার ৪৫টি উপজেলায় মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান ও নামজারির খতিয়ান ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সংরক্ষণ, কোনোক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে অনলাইনে উপস্থাপন, অনলাইনে খতিয়ানের সব উত্তোলনের আবেদন ও নামজারির আবেদন গ্রহণ উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এক লাখ ৪২ হাজার ৭৩টি ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে ৬৯ হাজার ৫৯১ একর কৃষি খাস জমি বরাদ্দ, চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ছয় হাজার ১৮৫টি ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে প্রায় নয় হাজার একর খাস জমি বরাদ্দ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক