ভারতের অনাপত্তি আদায়ের চেষ্টা
গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারত যাতে কোনো আপত্তি না জানায়, তার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশাল এ প্রকল্প বাস্তবায়নে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে অনাপত্তির জন্য ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ‘নোট ভারবাল’ পাঠাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে।
গঙ্গা ব্যারাজের বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের গঙ্গা ব্যারাজের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তিনটি অনুশাসনের জবাবও দেওয়া হয়েছে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে সুন্দরবনসহ দেশের ৩৭ শতাংশ এলাকার জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের সদস্য পর্যায়ের একটি কারিগরি বৈঠকের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় চেষ্টা চালাচ্ছে।
প্রতিবেদন সম্পর্কে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর আহমেদ খান এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ ভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গঙ্গা ব্যারাজ খুব প্রয়োজনীয় একটি প্রকল্প। এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রধান প্রকল্প হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীও এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ভারতের সম্মতি পাওয়ার চেষ্টা করছি।’ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উভয় দেশই সমানভাবে লাভবান হবে বলে সচিব জানান।
গঙ্গা ব্যারাজের অর্থায়নের বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত কারিগরি কাজ সম্পন্ন করেছে। গঙ্গা ব্যারাজ, গড়াই রেগুলেটর, পাওয়ার প্ল্যান্ট, বিভিন্ন নদীর লিংকসহ সংশ্লিষ্ট কাজে প্রায় ৩১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে সাত বছর। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। শুধু নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, টোল প্লাজা, কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দপ্তর ভবন, নির্মাণকালীন স্টক ইয়ার্ড ও বিদ্যমান নদী নেটওয়ার্কের সংযোগ স্থাপনের জন্য কিছু জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়ে ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত ৩২তম বৈঠক, ১৯৯৯ সালে অনুষ্ঠিত ৩৩তম বৈঠক এবং ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত ৩৪তম বৈঠকে আলোচনা হয়। ওই সময় বাংলাদেশের এ প্রস্তাবকে ভারত স্বাগত জানায়।
ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার কনসালট্যান্সি সার্ভিস—ইন্ডিয়া’র মাধ্যমে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়। গত বছর সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারত-বাংলাদেশ যৌথ পরামর্শক কমিশনের তৃতীয় সভায় বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত ভারতীয় পানিসম্পদমন্ত্রীর কছে হস্তান্তর করেন। ওই সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিবেদন সরবরাহের অনুরোধ জানায়। গত এপ্রিল মাসে ভারতের চাহিদার আলোকে প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশ সব ধরনের প্রতিবেদন সরবরাহ করে।
গত এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের বিষয়ে তিনটি অনুশাসন প্রদান করেন। অনুশাসন তিনটির জবাবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে গত জুন মাসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে প্রকাশিত যৌথ ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর ওপর যৌথভাবে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণে ভারতের সহযোগিতার আহ্বান জানালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে বলে আশ্বস্ত করেন।
শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার বাংলাদেশ অংশের স্বাভাবিক প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখতে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের প্রাপ্ত পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্যই এ প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নকশা করা হয়েছে। এ প্রকল্পের ফলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ রোধ হবে এবং এ প্রকল্পের পানির গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বরেন্দ্র প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর তৃতীয় অনুশাসন সম্পর্কে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যারাজ নির্মাণের ফলে গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী বাংলদেশে প্রাপ্ত পানিপ্রবাহের দ্বারা ১৬৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য একটি রিজার্ভার সৃষ্টি হবে। এর মধ্যে ৮২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার রিজার্ভারের উভয় তীর বাংলাদেশে অবস্থিত এবং অবশিষ্ট ৮২ দশমিক ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য রিজার্ভারের ডান তীর ভারতের অংশে ও বাম তীর বাংলাদেশ অংশে অবস্থিত। এর মাধ্যমে সমুদ্র থেকে লবণাক্ততা অনুপ্রবেশ রোধ হবে এবং কৃষি, মৎস্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নৌ চলাচলসহ অন্যান্য খাতে ব্যবহৃত হবে।
গঙ্গা ব্যারাজ বিষয়ে সচিব ড. জাফর আহমেদ খান আরো বলেন, ‘গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ হলে আমরা যেমন লাভবান হবো, ঠিক একইভাবে ভারতও লাভবান হবে। সুন্দরবন উভয় দেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এ সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে গঙ্গা ব্যারাজের বিকল্প কোনো পথ নেই। আশা করছি, উভয় দেশই এ ব্যারাজের গুরুত্ব বিবেচনা করে এগিয়ে আসবে।’

এম এ নোমান