‘তাসের দেশ’-এ উপচে পড়া ভিড়
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী নাট্যোৎসবের আজ তৃতীয় দিন হতে চলল। এই করি, সেই করি কিন্তু আসল কাজই যেন করা হচ্ছে না। আজ শুক্রবার ছুটির দিন। তাই সকালেই ঠিক করেছিলাম এই নাট্যোৎসবে নাটক দেখব। তাই সকাল সকাল টিকেটও কেটে ফেলি। দৈবক্রমে টিকেটও জুটে যায় পছন্দের নাটক, ‘তাসের দেশ’-এর। নাটকটি দেখব বলে সারা দিন ধরেই মনে চাপা উত্তেজনা কাজ করছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের আয়োজনে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ-ভারত নাট্যোৎসব ২০১৫’ শুরু হয় ২৮ অক্টোবর। ওই দিন ড. মীর মেহবুব আলম নাহিদের নিদের্শনায় ‘টিনের তলোয়ার’ মঞ্চায়ন করে রাবি নাট্যকলা বিভাগ।
আজ তৃতীয় দিনে বিকেল ৫টায় মঞ্চায়ন হয় ‘তাসের দেশ’-এর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত নাটকটি নিদের্শনা দিয়েছেন অসীম দাশ। নাটকটি প্রযোজনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ।
৫টা বাজতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকি থাকতে যখন নাটক দেখতে মিলনায়তনে ঢুকলাম, তখন অবাক না হয়ে পারলাম না। কারণ এরই মধ্যে বিশাল আকারের এই মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ। নাটক শুরুর সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চুপ হয়ে যায় পুরো মিলনায়তন। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত যেতে না যেতেই হাতের করতালির আওয়াজে কেঁপে ওঠে মিলনায়তন। নাটক চলার সময় কিছুক্ষণ পরপরই এমন মিলনায়তন কাঁপানো করতালির আওয়াজ পাওয়া যায়।
আর এমন প্রশংসাধ্বনি পাবেই বা কেন? অভিনয়, লাইট, নৃত্য, সংগীতের যে চমৎকার সম্মিলন, আবার তার সঙ্গে রয়েছে মুক্তির বার্তা। ‘তাসের দেশ’-এর শুরু দেখা যায়, বৈচিত্র্যহীন-যান্ত্রিক-একঘেঁয়ে বিষাদময় এক জীবন। এই জীবনকে মেনে নিতে পারেন না মুক্তিপ্রিয় রাজপুত্র। তাই বন্ধু সওদাগরপুত্রকে নিয়ে রাজপুত্র বেরিয়ে পড়েন বৈচিত্র্যের সন্ধানে, অজানার উদ্দেশ্যে।
সাগর পাড়ি দিয়ে তাঁরা পৌঁছে যান তাসের দেশে। যেখানে সবকিছুই নিয়মমতো চলে। একেবারে শৃঙ্খলিত। রাজা হ্যাঁ বললে হ্যাঁ, না বলে সবাই না। রাজ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত কিছু নেই। নেই এগিয়ে চলার গতি। রাজপুত্রের চঞ্চল চিত্ত ও বেড়ার নিয়ম ভাঙার চিন্তাধারা সংক্রমিত করে তাসের দেশের নারী-পুরুষদের। প্রজার সঙ্গে রানিও যোগ দেন বিদ্রোহে। একপর্যায়ে রাজা জনমতকে মেনে নিতে বাধ্য হন। ফলে রাজ্যের নিয়ম-কানুনের অচলায়তন ভেঙে মুক্তির সুরে চলে তাসের দেশ।
নাটকটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করতালির ধুম পড়ে যায়। নাটকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। কারণ রবীন্দ্রনাথ রচিত এই নাটকটি বোঝা একটু জটিলই বটে। তাসের দেশ নিয়ে নির্মাণ হয়েছে সিনেমাও। এ নিয়ে রাবির সাবেক শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন মিলন বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের রচনা ও সিনেমায় তাসের দেশ যতটুকু জটিল লাগে এখানে তার চেয়ে অনেক সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’
নাটক শেষে কথা হয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের সাকিব ও আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী স্বর্ণার সঙ্গে। এ সময় স্বর্ণা বলেন, ‘কাহিনী পরিষ্কার ছিল। যারা সাধারণত নাটক দেখে না তারাও আজকের নাটক বুঝতে পারবে।’ আর সাকিব নাচ, গান সিলেকশনের প্রশংসা করেন।
তবে নাটক দেখে সবাই যে প্রশংসা করেছে তা নয়। কিছু বিষয়ের সমালোচনা করে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আল-মামুন বলেন, ‘নাটকে রেকর্ড গান বাজানো ভালো লাগেনি। আর কিছু কিছু অভিনয় দুর্বল ছিল। তারপরও নাটকটি মোটামুটি ভালোই লেগেছে।’
নাটকে অভিনয় করেছেন লেলিন, অলি, মামুনুল হক, উম্মে রহিমা, ইয়াসমিন, নাজমুল হুদা, ইমু, আবির মণ্ডল, আবিরসহ ত্রিশাধিক নাট্যকর্মী। তাসের দেশের পর সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে অনন্ত হিরার নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় ‘আওরঙ্গজেব’। নাটকটি প্রযোজনা করে ঢাকার প্রাঙ্গণেমোর।

রাবি সংবাদদাতা