পুণ্যস্নানের মধ্য দিয়ে শেষ হলো রাস উৎসব
সুন্দরবনের দুবলার চরের আলোরকোলে আজ বৃহস্পতিবার ভোরে পূর্ণিমার প্রথম জোয়ারে সমুদ্রের পানিতে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের পুণ্যস্নানে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে তিনদিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব।
এবার দেশ-বিদেশের প্রায় ৩০ হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী নর-নারী তাঁদের পাপ মোচনের প্রত্যাশায় পূণ্যস্নানে অংশ নেন। এর আগে দুবলার আলোরকোলের অস্থায়ী রাস মন্দিরে ভগবান শ্রী কৃষ্ণসহ দেব-দেবীদের উদ্দেশ্যে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন পুণ্যার্থীরা।
এই পূজা-অর্চনার আগে বুধবার রাতে অস্থায়ী মন্দির প্রাঙ্গণে রাস উৎসবের উদ্বোধন করেন র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। তিনি সুন্দরবনসহ উপকূল ‘দস্যুমুক্ত’ করার ঘোষণা দেন। সেই সঙ্গে সুন্দরবনে র্যাবের আরো দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে বলেও পুণ্যার্থী, পর্যটক ও জেলেদের জানান।
রাস উৎসব শেষে সুন্দরবন বিভাগের নির্ধারিত আটটি নৌপথ দিয়ে লঞ্চ, ইঞ্চিনচালিত নৌকা ও ট্রলারে করে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই লোকালয়ে ফিরতে শুরু করেছে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থী।
রাস উৎসব উপলক্ষে গত শনিবার থেকে গোটা সুন্দরবনে ১০ দিনের রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। বাতিল করা হয় সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) সাইদুল ইসলাম দুবলার চরের আলোরকোল থেকে জানান, এ বছর ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তিনদিনের রাস উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে বৃহস্পতিবার ভোরে শেষ হয়েছে। সুন্দরবন বিভাগের নির্দিষ্ট করে দেওয়া আটটি নৌপথ দিয়ে লঞ্চ, ইঞ্চিনচালিত নৌকা ও ট্রলারে করে সকাল থেকেই লোকালয়ে ফিরতে শুরু করেছে হাজার হাজার দর্শনার্থী। এসব পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর সার্বিক নিরাপত্তাসহ হরিণ শিকার রোধে বনরক্ষীদের ২০টি ভ্রাম্যমাণ দলসহ এবার র্যাব, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও পুলিশের ছিল নিয়মিত টহল।

এবার রাস উৎসবের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেখভাল করতে বুধবার দুপুর থেকে দুইদিনের জন্য সুন্দরবনের দুবলার চরের আলোরকোলে যান র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, পুলিশের খুলনা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এসএম মনিরুজ্জামান, র্যাব ৬-এর অধিনায়ক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম, এসিএফ কামাল উদ্দিন আহমেদসহ কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা।
রাস উৎসব উপলক্ষে এবার দুবলার চরের আলোরকোল থেকে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বন বিভাগ ও রাস উৎসব উদযাপন কমিটির কর্মকর্তাদের দিক নির্দেশনায় এবার রক্ষা পেয়েছে হরিণসহ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। এ সময়ে বনদস্যুদের হাতে ঘটেনি পুণ্যার্থী, প্রতিবেশ পর্যটক (ইকো ট্যুরিস্ট) ও দুবলা শুঁটকি পল্লীর কোনো জেলের মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের কোনো ঘটনা।
সুন্দরবন বিভাগের পক্ষ থেকে এবার পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর আগ্নেয়াস্ত্র-বিস্ফোরক দ্রব্য সঙ্গে নেওয়া, সুন্দরবন থেকে রান্নার কাঠ আহরণ ও হাঁস- মুরগির মাংস ছাড়া সব ধরনের মাংস নিষিদ্ধ করায় হরিণ নিধন বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাস উৎসবে অংশ নেওয়া অনেক ইকো ট্যুরিস্ট।
রাস উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) জিয়া উদ্দিন জানান, বঙ্গোপসাগর উপকূলে সুন্দরবনের দুবলারচরের আলোরকোলে এবারের রাস উৎসবে প্রায় ৩০ হাজার দেশি-বিদেশি পুণ্যার্থী ও ইকো ট্যুরিস্ট অংশ নেন। সুন্দরবন বিভাগের হিসাবে এ বছর ১৩২তম রাস উৎসব হলেও ঐতিহাসিকদের মতে, ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকেই সুন্দরবনে রাস উৎসব হয়ে আসছে। প্রতিবছর বাংলা কার্ত্তৃক মাসের শেষে বা অগ্রহায়ণের প্রথম দিকের রাস পূর্ণিমার তিথিতে এই রাস উৎসব উদযাপিত হয়ে থাকে। কালের বিবর্তনে জেলে ও বনজীবীসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও সুন্দরবনের দরবেশ গাজী-কালুর স্মরণে মানত দিতে এই উৎসবে যোগ দিয়ে থাকে। হাজার-হাজার মানুষের পদচারণায় এই রাস উৎসব মেলায় পরিণত হয়েছিল। এই উৎসব এখন সর্বজনীন রূপ পেয়েছে। এবারও এসেছিল অসংখ্য বিদেশি পর্যটক।
রাস উৎসবে আলোরকোলে তিনদিনব্যাপী মেলায় কুটির শিল্পের বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে ছিল ব্যবসায়ীরা। রাস উৎসব উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছিল নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। সব মিলিয়ে এবারের রাস উৎসব শান্তিপূর্ণ ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়ায় কমিটির সভাপতি হিসেবে জিয়া উদ্দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান।

আবু হোসাইন সুমন, মোংলা