যেসব অপরাধে দণ্ড বহাল মীর কাসেমের
মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, অপহরণ, নির্যাতনসহ ১৪টি অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। এগুলোর মধ্যে চূড়ান্ত রায়ে একটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। আরো ছয়টি অভিযোগে তাঁর দণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। এ সব অভিযোগে তাঁর ৫৮ বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।
সর্বমোট ১৪টি অভিযোগের মধ্যে চূড়ান্ত রায়ে আপিল বিভাগ সাতটি অভিযোগে মীর কাসেমকে দণ্ড দেন। এবং তিনটি অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেন। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনাল চারটি অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়ায় মোট সাতটি অভিযোগ থেকে খালাস পেলেন মীর কাসেম আলী।
যে অপরাধে আপিলে মৃত্যুদণ্ড বহাল
প্রসিকিউশনের আনা ১১ নম্বর অপরাধে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা কিশোর জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যান। তাকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হয়। তার লাশসহ ছয়টি লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনালেও তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়।
ছয়টি অভিযোগে ৫৮ বছরের দণ্ড বহাল
প্রসিকিউশনের আনা ২ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে ২০ বছর কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর দুপুর ২টার দিকে মীর কাসেম আলীর নেত্বত্বে দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও আল-বদর বাহিনী লুৎফর রহমান ফারুক ও সিরাজকে চাক্তাই এলাকার বকশিরহাটে জনৈক সৈয়দের বাড়ি থেকে অপহরণ করে। এরপর তাদের আন্দরকিল্লার মহামায়া হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়, যা সে সময় ডালিম হোটেলে টর্চার সেল নামে পরিচিত ছিল। সেলটি মীর কাসেম আলীর নেত্বত্বে পরিচালিত হতো। পরে লুৎফর রহমান ফারুককে বাইরে নিয়ে গিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের কর্মীদের বাড়িগুলো চিহ্নিত করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ফারুককে আরো দু-তিনদিন ডালিম হোটেলে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। এরপর তায়কে সার্কিট হাউসে নিয়ে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেয় আল-বদর। সেখানেও তার ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠানো হয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পরে সেখান থেকে ছাড়া পান ফারুক।
অভিযোগ নম্বর ৩ : মীর কাসেম আলীর সাত বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। এ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২২ অথবা ২৩ নভেম্বর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে ডবলমুরিং থানাধীন কদমতলীতে তাঁর বাসা থেকে মীর কাসেম আলীর নেত্বত্বে অপহরণ করে আল-বদর ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকেরা। তাঁকে ডালিম হোটেলের নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে মীর কাসেম আলীর উপস্থিতিতে নির্যাতন চালানো হয়। দেশ স্বাধীন হলে ১৬ ডিসেম্বর সকালে ডালিম হোটেল থেকে জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার করে তাঁর আত্মীয় ও স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন।
অভিযোগ নম্বর ৭ : সাত বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। এ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর মাগরিবের নামাজের পরে মীর কাসেমের নির্দেশে ডবলমুরিং থানাধীন ১১১ উত্তর নলাপাড়া থেকে মো. সানাউল্লাহ চৌধুরী, হাবিবুর রহমান ও ইলিয়াসকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায় আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা।
সেখানে তাঁদের আটকে রেখে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়। মীর কাসেমের নিয়ন্ত্রণে থাকা এ নির্যাতন কেন্দ্রে আটক থাকার সময় তাঁরা আরো অনেককে আটক অবস্থায় দেখতে পান। এঁদের অনেককে আবার ডালিম হোটেল থেকে নিয়ে যেতে দেখেন তাঁরা, এবং পরে শুনতে পান যে বদর বাহিনীর সদস্যরা তাদের মেরে ফেলেছে। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করার শর্তে মীর কাসেমের নির্দেশে ৬ ডিসেম্বর হাবিবুর রহমান এবং ৯ ডিসেম্বর মো. সানাউল্লাহ চৌধুরীকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ নম্বর ৯ : মীর কাসেম আলীকে সাত বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। এ অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ২৯ নভেম্বর ভোরে মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে চাঁদগাঁও থানাধীন নাজিরবাড়ি এলাকা থেকে পাঁচ চাচাতো ভাইসহ নুরুজ্জামানকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায় আল-বদর বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। সেখানে তাঁদের আটকে রেখে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্যাতন করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পরে তাদেরকে সেখান থেকে মুক্ত করা হয়।
অভিযোগ নম্বর ১০ : সাত বছর কারাদণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এ অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৯ নভেম্বর ভোর ৫টার দিকে মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা নাজিরবাড়ি এলাকা ঘেরাও করে মো. জাকারিয়া, মো. সালাউদ্দিন ওরফে ছুট্টু মিয়া, ইস্কান্দর আলম চৌধুরী, মো. নাজিম উদ্দিনসহ আরো অনেককে অপহরণ করে এবং এনএমসি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে নিয়ে যায়। পরে তাদের সবাইকে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। বয়সে ছোট হওয়ায় নাজিমুদ্দিনকে পরদিন ছেড়ে দেওয়া হয়। সাত-আটদিন পর মো. জাকারিয়াকে, ১১ অথবা ১২ ডিসেম্বর মো. সালাউদ্দিন ওরফে ছুট্টু মিয়াকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সবশেষে ইস্কান্দর আলম চৌধুরী ১৬ ডিসেম্বর ছাড়া পান।
অভিযোগ নম্বর ১৪ : মীর কাসেমকে ১০ বছরের দণ্ড বহাল রাখা হয়। এ অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানাধীন নাজির আহমেদ চৌধুরী রোডে এ জে এম নাসিরুদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয় নেন নাসিরুদ্দিন চৌধুরী। একদিন গভীর রাতে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে কয়েকজন আল-বদর সদস্য ওই বাড়ি ঘিরে ফেলে। তারা নাসিরুদ্দীন চৌধুরীকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায় এবং সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন চালায়। ১৬ ডিসেম্বর ডালিম হোটেল থেকে আরো এক-দেড়শ লোকের সঙ্গে নাসিরুদ্দীনকেও উদ্ধার স্থানীয়রা।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় নভেম্বর মাসের কোনো একদিন মীর কাসেম আলীর পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা হিন্দু অধ্যুষিত হাজারি লেনের ১৩৯ নম্বর বাড়ি থেকে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং ১১৪ নম্বর বাড়ি থেকে রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেন ওরফে রাজুকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরদিন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে ছেড়ে দেওয়া হলেও লাঠু ও রাজুকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়। এই তিনজনকে অপহরণের সময় আলবদর বাহিনী এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা অনেক দোকানপাট লুট করে এবং অন্তত আড়াইশ বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এর ফলে অন্তত ১০০ হিন্দু পরিবার ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়। তবে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে এ অভিযোগ থেকে খালাস পান মীর কাসেম।

মোঃ জাকের হোসেন (Md Zaker Hossain)