প্রার্থীদের বড় অংশই ব্যবসায়ী
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের অর্ধেক প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের নিচে। ঢাকা উত্তরে মামলা আছে প্রায় ৩২ শতাংশ প্রার্থীর নামে, যার ৭ শতাংশই আবার হত্যা মামলা। ঢাকা দক্ষিণের প্রার্থীদের প্রায় ৩৪ শতাংশের বিরুদ্ধে মামলা আছে, যার ৯ শতাংশই হত্যা মামলা। এবারও প্রার্থীদের একটা বড় অংশই ব্যবসায়ী।
আজ সোমবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ’ তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাহী সদস্য হামিদা হোসেন ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তথ্য গোপন করছেন প্রার্থীরা
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘শিক্ষাগত যোগ্যতার জায়গায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থীরা বলেছেন যে এটা প্রযোজ্য নয়। কিংবা তাঁরা জায়গাটা খালি রেখেছেন। এটা তো আমি মনে করি, বড় ত্রুটি। কারণ এ তথ্যগুলো হলফনামার মাধ্যমে দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো ভোটাররা যাতে এসব তথ্য নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। যাঁরা বলেন তথ্য প্রযোজ্য নয়, কিংবা তথ্য দেননি, তাঁদের তো প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার কথা। জানি না রিটার্নিং কর্মকর্তা কেন কোনোরকম ব্যবস্থা নেননি।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী আইন তোয়াক্কা করে না। প্রার্থীরা করেন না। নির্বাচনী আইন কানুন প্রয়োগের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের অগাধ ক্ষমতা আছে। তারা প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে।’
ব্যবসায়ীদের আধিক্য
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। অবশ্যই ব্যবসায়ীদের সব রকম সুযোগ আছে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার, নির্বাচিত হওয়ার। কিন্তু সব যদি ব্যবসায়ী হন; আমার আশঙ্কা যে আমরা নির্বাচনের পর দেখব যে অন্তত ৯০ শতাংশ ব্যবসায়ী।’ তিনি আরো বলেন, ‘মেয়ররা তো সবাই ব্যবসায়ী হবেন, এতে আমাদের সামান্যতম সন্দেহ নেই বোধ হয়। এ দেশে একটা ক্ষুদ্র অংশ ব্যবসায়ী। তাহলে ব্যবসায়ীদের স্বার্থেই কি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হবে? ব্যবসায়ীদেরই সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে? ভোটারদের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার।’
বদিউল আলম মজুমদার আরো বলেন, ‘কেউ যদি সিটি করপোরেশনের ঠিকাদার হন তিনি কিন্তু প্রার্থী হওয়ার যোগ্য নন। কিন্তু অনেক প্রার্থী আছেন যারা ঠিকাদার এবং ঠিকাদারি লাইসেন্স অন্যের নামে দিয়ে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, চূড়ান্ত প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের প্রার্থিতা গৃহীত হয়েছে। এখন এঁরা যদি নির্বাচিত হন, তাহলে কী হবে? সিটি করপোরেশন তো দুর্নীতির আখড়া হয়েছে। এখন এঁরা যদি নির্বাচিত হন, তাহলে মুরগিগুলো কাদের কাছে দেব? শিয়ালের কাছে মুরগির পাহারা দিয়ে দেব? নাগরিক হিসেবে আমরা শঙ্কিত ও চিন্তিত।’
মামলা থাকলেই দোষী নন
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে দেখা গেছে, কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে বিশেষ করে বিরোধী দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে অধিক মামলা। আমরা জানি, হয়রানিমূলক মামলা হয় এবং মামলাগুলো প্রত্যাহার হয়, এমনকি হত্যা মামলাও প্রত্যাহার হয়। মামলা আছে বলেই তাঁরা দোষী তা নন। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে মানুষ নিরপরাধ থাকে।’
সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রশ্নে বদিউল আলম বলেন, ‘আমরা এ দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। অতীতে উপজেলা নির্বাচনে আমরা কারচুপি দেখেছি, সিল মারা দেখেছি, ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা দেখেছি। এগুলো যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়। যদি নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করতে পারে তা হবে না, তাহলে সেনা মোতায়েনের দরকার নেই। আবার নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে সেনা মোতায়েনের দরকার তা নির্বাচন কমিশনেরই দায়িত্ব।’
সংরক্ষিত আসন পদ্ধতিটা ত্রুটিপূর্ণ
বদিউল আলম বলেন, ‘নির্বাচনে সাধারণ কাউন্সিলর আসনে নারীর সংখ্যা সীমিত। এর কারণ হচ্ছে নারীরা আগ্রহী নয়। কারণ নারীরা নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান না। আর সংরক্ষণ পদ্ধতিটাই ত্রুটিপূর্ণ। এ সংরক্ষণ পদ্ধতি নারীকে আলংকারিক করে রাখে। এ পদ্ধতি বদলানো দরকার।’
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশের সফল মেয়রদের কথা যদি আমরা বলি, সবাই আমরা একবাক্যে মেনে নেব, নারায়ণগঞ্জের সেলিনা হায়াৎ আইভী সফল মেয়রদের অন্যতম। একজন নারী সফল মেয়র হওয়ার পরেও নারীদের মেয়র পদে প্রার্থী না হওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হতে পারে আয় ও ব্যয়ের হিসাব। কারণ অর্থশালী নারী ব্যবসায়ী হয়তো খুঁজে পায়নি রাজনৈতিক দলগুলো।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হয়নি। কারণ গতকালও আমরা টিভিতে দেখেছি অনেক প্রার্থী নিজেরা বের হতে পারছেন না। ভয় পাচ্ছেন। আগাম জামিন নেওয়ার কথা বলছেন।’

নিজস্ব প্রতিবেদক