গোমতীর দুই পাড়ে মাটি লুটের মহোৎসব
কুমিল্লায় গোমতী নদীর দুই পাড়ে অবৈধভাবে মাটি কাটার মহোৎসব চলছে। শীতের শুরুতেই আদর্শ সদর উপজেলার পালপাড়া থেকে গোলাবাড়ি পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে ট্রাক্টর নিয়ে রাতদিন মাটি তোলা হচ্ছে। নদীর পাড় থেকে মাটি কাটার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে নদীর বাঁধ, সংরক্ষিত সড়ক ও সেতু। বিষয়টি স্থানীয়দের উদ্যোগের কারণে হলেও জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনও তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয়রা জানান, নদীর উত্তর তীরে ৫ কিলোমিটার এবং দক্ষিণ তীরে মোটামুটি ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ট্রাক্টর ওঠানামা করছে। এসব ট্রাক্টরে নদীর মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটা ও বসতবাড়িতে ব্যবহারের জন্য। নদীর উৎসমুখ কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার কটকবাজার ও গোলাবাড়ি থেকে শুরু করে পালপাড়া পীরবাড়ির সামনে পর্যন্ত উভয় তীরে মাটি কাটার প্রক্রিয়া চলছে প্রকাশ্যে। এতে গোমতীর বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাঁধসংলগ্ন পাকা সড়কের বিভিন্ন স্থান থেকে পিচ উঠে গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর দক্ষিণ তীরে দুর্গাপুর, ভাটপাড়া, পালপাড়া পীরবাড়ি, কাপ্তানবাজার, চানপুর মাস্টারবাড়ি, শালধর এবং সামারচর এলাকায় অন্তত ২০টি ট্রাক্টর দিয়ে মাটি তোলা হচ্ছে। এসব ট্রাক্টর চলাচলের জন্য সড়কের একটি অংশ কেটে বাঁধের ভেতর দিয়ে চলার পথ তৈরি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নদীর উত্তর পাড়ে ছত্রখিল এলাকায় অবস্থিত পুলিশ ফাঁড়ির সামনেই চলছে মাটি কাটার কাজ। বৈদ্যুতিক খুঁটির গোড়া ও নদী তীরের গাছের নিচ থেকেও মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। চানপুর বেইলি সেতু এবং কাপ্তান বাজার পশ্চিম অংশেও মাটি কাটতে দেখা গেছে।
নদীর দুই তীরে মোট ৭টি ঘাট থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোমতীর স্বাভাবিক গতিপথ, নদীর চরসহ তীরবর্তী পরিবেশ।
এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কর্মযজ্ঞ চালানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অভিযান চোখে পড়ে না। প্রশাসন যেন নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে।
ট্রাক্টরচালকদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতি ট্রাক্টর মাটি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।
স্থানীয় এক মাটি ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা এই মাটি ট্রাক্টরে করে ইটভাটা ও আশপাশের বিভিন্ন নির্মাণস্থলে সরবরাহ করে থাকি। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের কিছু লোককে ম্যানেজ করেই এই ব্যবসা চালাতে হচ্ছে।’
গোমতি নদীর চর দখল করে কোটি কোটি টাকার মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার উত্তর দূর্গাপুর ইউনিয়নের আড়াইওড়া মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. জহিরুল ইসলাম। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ধারী এই ব্যক্তি গত ১৭ বছর প্রভাব বিস্তার করে এবার স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকে ম্যানেজ করে গোমতির মাটি কাটা অব্যাহত রেখেছেন। তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় স্থাপনার মাটি কেটে বিক্রির করার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ স্বীকার করে জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর পাড়সংলগ্ন আমার একটি পুকুর আছে, আমি সেখান থেকে মাটি কাটছি। মাটি কাটার সঙ্গে আমি একা জড়িত নই, স্থানীয় (রাজনৈতিক) নেতারা ও প্রশাসনের লোকজনও এই কাজে জড়িত।’
এই বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. রেজা হাসান বলেন, জনগণকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার নির্দেশনা দিয়েছি।
মো. রেজা হাসান বলেন, মাটি কাটা ও বালু উত্তোলনের কোনো অনুমতি জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হয়নি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও জানান, অবৈধ মাটি কাটা ও বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। জেলা প্রশাসন বরাবরই এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সজাগ রয়েছে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তা নিয়ে মাটি কাটার স্থানগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)