উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই শুরু আজ
কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) ছিল নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। ৩০০ সংসদীয় আসনে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
দলীয় ও স্বতন্ত্র সম্ভাব্য প্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত অনেক নেতা স্বতন্ত্র বা অন্য দলের ব্যানারে প্রায় শতাধিক আসনে মনোনয়ন দাখিল করেছেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা দলীয়ভাবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। তবে কোন দল থেকে কতজন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেছেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। ঢাকার ৪১টি সংসদীয় আসনে জমা পড়েছে ৪৪৪টি মনোনয়নপত্র। ফরিদপুর অঞ্চলের ১৫টি আসনে ১৪২টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২৩টি আসনে ১৯৪টি, কুমিল্লা অঞ্চলের ৩৫টি আসনে ৩৬৫টি, রাজশাহী অঞ্চলের ৩৯টি আসনে ২৬০টি, খুলনা অঞ্চলের ৩৬টি আসনে ২৭৬টি, বরিশাল অঞ্চলের ২১টি আসনে ১৬৬টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৩৮টি আসনে ৩১১টি, সিলেট অঞ্চলের ১৯টি আসনে ১৪৬টি এবং রংপুর অঞ্চলের ৩৩টি আসনে ২৭৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
দেশের বিভিন্ন আসনে কোথাও প্রার্থী নিজে, আবার কোথাও প্রার্থীর পক্ষে প্রস্তাবক ও সমর্থকরা মনোনয়নপত্র জমা দেন। বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশ প্রার্থী শেষ দিনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নিবন্ধন স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ছাড়া নিবন্ধিত অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। অতীতের মতো এবারও জোটবদ্ধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে ডজনখানেক দল। অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে রয়েছে ১১ দলীয় জোট। জাতীয় পার্টিসহ কিছু দল এককভাবে এবং অনেক প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন।
এবারের নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তিনটি আসন- বগুড়া-৭, ফেনী-১ ও দিনাজপুর-৩ থেকে মনোনয়ন দাখিল করেছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মনোনয়ন দাখিল করেছেন বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসনে। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. মো. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে মনোনয়ন দাখিল করেছেন।
এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, এবি পার্টির মুজিবুর রহমান ভুঁইয়া মঞ্জ ও ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, জাতীয় নাগরিক পার্টির নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরু, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দারও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংরক্ষিত এমপি রুমিন ফারহানা, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসান মামুন, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, ডা. শহিদুল আলম ও লুৎফুর রহমান খান আজাদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তবে এনসিপি থেকে পদত্যাগকারী আলোচিত নারী নেত্রী তাসনিম জারা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিরো আলমসহ কয়েকজন প্রার্থী কাগজপত্রে ত্রুটি থাকায় মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। অনেক মনোনয়নপত্রে তথ্যগত ঘাটতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। কোথাও হলফনামায় প্রার্থীর স্বাক্ষর নেই, আবার কোথাও ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর অনুপস্থিত ছিল।
ইসির কর্মকর্তারা জানান, দলীয় প্রার্থীরা দল মনোনীত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বাক্ষরে সরাসরি মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সাবেক সংসদ সদস্য ছাড়া সংশ্লিষ্ট আসনের মোট ভোটারের ১ শতাংশ নাগরিকের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া জামানতের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রার্থী ও তার নির্ভরশীলদের তথ্য, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণী এবং হলফনামা দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এদিকে, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় আর বাড়ানো হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সোমবার বিকেল ৫টায় সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সোমবারই ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন।
গত ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেন। সময়সূচি অনুযায়ী, জমা পড়া মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শুরু হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে, যা চলবে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
নেত্রকোনা-৪ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর মনোনয়ন দাখিল করেছেন। একই আসন থেকে তার স্ত্রী তাহমিনা বাবর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
সিলেট-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ইলিয়াস আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াস অর্ণব।
মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী। একই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন তার ছেলে ব্যবসায়ী মুঈদ আশিদ চিশতি।
কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল কালাম। একই আসনে তার ছেলে ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল আশিক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন।
টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান খান আজাদ মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ হোসনে মোবারক এবং এনসিপির প্রার্থী হিসেবে সাইফুল্লাহ হায়দার মনোনয়ন দাখিল করেছেন।
কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি ও মেঘনা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জনগণের প্রতি ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। সোমবার দাউদকান্দি ঈদগাহ মাঠ ও মেঘনায় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।
রংপুর সদর ও আংশিক সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের পক্ষে মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) সংসদীয় আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। সোমবার বিকেলে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ফেরদৌস আরার কাছে সাকি মনোনয়নপত্র জমা দেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। এই আসনে গণসংহতি আন্দোলনকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই আসনে দলটির প্রার্থী হয়েছেন প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।

নিজস্ব প্রতিবেদক