‘আমি আপনার জামাই হতে চাই’
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বিয়ের ঘটনাটি অনেকটা রূপকথার কাহিনির মতো। যদিও তারা কেউই রাজপুত্র বা রাজকন্যা ছিলেন না। কিন্তু তাদের বিয়ে হয় অনেকটা এভাবেই।
খালেদা জিয়া ছিলেন জিয়াউর রহমানের দূর-সম্পর্কীয় খালাতো বোন। জিয়াউর রহমান তাঁর মকবুল নানার কাছে প্রথম শুনেছিলেন খালেদা জিয়ার কথা। শুনেছিলেন তার সেই খালাতো বোনটি দেখতে রাজকন্যার মতো। মকবুল নানা জিয়াকে তার ওই বোন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ওকে অন্ধকার রাতে দেখলে মনে হবে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে।’ জিয়া তাঁর এক মামার (ছবি মামা) কাছেও বেগম জিয়ার একই প্রশংসা শুনেছিলেন। জিয়ার খুব ইচ্ছে হলো তার সেই বোনটিকে এক নজর দেখার। তখন জিয়া কলেজের ছাত্র। একদিন দিনাজপুর যাওয়া সুযোগ হলো। সেই সুবাদেই জিয়া দেখতে পেলেন খালেদা জিয়াকে। খালেদা জিয়া তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। তাকে দেখে জিয়া তার নানা ও মামার দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিল খুঁজে পেলেন।
আরও পড়ুন : আপসহীন নক্ষত্রের বিদায়
ছোটবেলায় খালেদা জিয়া ছিলেন খুব লাজুক। কথা কম বলতেন। জিয়া খালেদার উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা ও সৌন্দর্যে বিমােহিত হলেন। তখনই জিয়া তাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখলেন। তাঁর এই স্বপ্নের কথা তিনি তার ছবি মামাকেও জানিয়েছিলেন। কলেজ থেকে একবার মামির কাছে লেখা চিঠিতেও তিনি লিখেছিলেন সেই ‘দিদিমণিটি’ কেমন আছে? সেই দিদিমণিটিই পুতুল। খালেদা খানম।
খালেদা জিয়ার বড়বোন খুরশীদ জাহান হক এভাবেই সেই বিয়ের বর্ণনা দিয়েছেন, যা উঠে আসে সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমেদের ‘নন্দিত নেত্রী খালেদা জিয়া’ বইতে।
আরও পড়ুন : আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ
খুরশীদ জাহান হকের ভাষ্যে, জিয়া তখন ছিল সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ডিএফআইর অফিসার হিসাবে ওর পোস্টিং হলো দিনাজপুরে। আমরা থাকতাম দিনাজপুরের ঈদগাঁ বস্তি এলাকায় ভাড়া বাসায়। দিনাজপুরের চাকরির সময় জিয়া মাঝে-মধ্যে আমাদের বাসায় আসত। জিয়ার একটা অসম্ভব গুণ ছিল, সে সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারত। পুতুল মেট্রিক পাস করার পর জিয়া একদিন আমাদের বাসায় এলো। আম্মার কাছে গিয়ে বলল, ‘খালা আমি আপনার জামাই হতে চাই।’ আম্মা হেসে ফেললেন। তখনই কিছু বললেন না। আব্বা বাসায় এলে তাকে বলা হলো। আব্বা শুনে বললেন, মন্দ কি? তবে পুতুলের বয়স তখন খুব কম। আম্মা এ ঘটনাটি আমার স্বামীকে (মোজাম্মেল হক) জানালেন। তিনি সদ্য আমেরিকা থেকে ফিরেছেন। তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না। কারণ তার যুক্তি ছিল পুতুলের বয়স খুব কম। মাত্র মেট্রিক পাস করেছে। ডিগ্রি পাস না করা পর্যন্ত বিয়ে হয় কী করে? অন্যদিকে জিয়া সেনাবাহিনীর লোক। এটা নিয়েও আমরা ভাবছিলাম। এই বিয়েতে প্রায় সবারই অমত ছিল। তবে জিয়াকে আমরা সবাই পছন্দ করতাম। এদিকে জিয়াও বারবার খবর নিতে থাকল। অবশেষে আমরা বিয়েতে সম্মত হই।
খালেদা জিয়ার মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের ভাষ্যে, তার মকবুল চাচা (জিয়ার নানা) পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জিয়ার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে মুদিপাড়ার বাসায় জিয়া ও খালেদা জিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ে হয়েছিল অনেকটা তাড়াহুড়ো করে। প্রথমে আকদ হয়েছিল। এক বছর পর ঢাকার শাহবাগ হোটেলে (বর্তমান পিজি হাসপাতাল) তাদের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
খালেদা জিয়ার ছোট ভাই সাঈদ ইস্কান্দরের এখনো মনে আছে সেই বিয়ের কথা। স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ছোট আপার বিয়েতে আমরা তেমন জাঁকজমক অনুষ্ঠান করিনি। খুব ইনফরমাল বিয়ে হয়েছে। শুধু আকদ। অবশ্য গায়ে হলুদ হয়েছে। ছোট আপার হাতে মেহেদি রাঙানো হয়েছে। হলুদ শাড়ি পরানো হয়েছে। বিয়েতে জিয়ার ছবি মামা, মকবুল নানাসহ কয়েকজন নিকটাত্মীয় এসেছিলেন। জিয়ার সঙ্গে তার সহকর্মী একজন পাঞ্জাবি অফিসারও বিয়েতে এসেছিলেন। জিয়ার বাবা মনসুর রহমান তখন পাকিস্তানে ছিলেন। জিয়ার মা বিয়ের আগেই ইন্তেকাল করেছেন। এক বছর পর ঢাকায় শাহবাগ হোটেলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আত্মীয়স্বজন অনেকেই এসেছিলেন।
আরও পড়ুন : কেউ বলল রাজকন্যা, কেউ লাল টুকটুকে মেয়ে!
বিয়ের স্মৃতি বর্ণনা করে মেজো বোন সেলিমা ইসলাম বিউটি বলেছেন, ১৯৬০ সালে আমার বিয়ের কয়েক মাস পরে আগস্ট মাসে পুতুলের বিয়ে ঠিক হয়। আম্মা হঠাৎ খবর দেন যে, তোমরা একটু আসো। বিয়েতে আড়ম্বর হয়নি। আমিই পুতুলকে গায়ে হলুদ দিয়েছি এবং মেহেদি মেখে দিয়েছি। জিয়ার সঙ্গে ওকে বেশ মানিয়েছিল।
বিয়ের পর জিয়া অবসর পেলেই বেগম জিয়াকে নিয়ে বেড়াতেন। একবার তারা বড় বোন খুরশীদ জাহানের খালিশপুরের বাসায় বেড়াতে যান। খুরশীদ জাহানের স্বামী মোজাম্মেল হক সাহেব খালিশপুর নিউজপ্রিন্ট মিলের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। সেই স্মৃতিও মনে আছে খুরশীদ জাহানের। তিনি বলেন, বিয়ের পর পরই ওরা আমাদের বাসায় এসেছিল। এখানে বেশ কয়েক দিন ছিল। এমন চমৎকার দম্পতি আমি দেখিনি। আমার বোন বলেই নয়, আসলে দুজনেরই একই গুণাবলী ছিল। একজন আরেকজনকে অসম্ভব ভালবাসত। পুতুলকে নিয়ে জিয়া আমার রান্নাঘরে এসে বসত। বলত, বড় আপা ওটা খাব, এটা খাব। বলত, বড় আপা আমার জন্য সেমাই রাঁধছেন! সেমাই ঠান্ডায় রেখে দিন। ঠান্ডা খেতে ভালো লাগে। আবার দেখতাম বলত– বড় আপা মাংস রাঁধছেন? দেন এক টুকরা মাংস। পুতুলকে দেখতাম লজ্জায় মরে যাচ্ছে। জিয়ার ওই সব ঘটনা নিয়ে পুতুল ওকে ক্ষ্যাপাত।
বেগম খুরশীদ জাহান হক আরও জানান, বিয়ের পর ওরা একবার বাগবাড়ি গ্রামেও গিয়েছিল। বগুড়ার বাগবাড়ি হলো জিয়ার গ্রামের বাড়ি। জিয়ার শৈশবের কিছুদিন ওখানেই কেটেছে। ১৯৬৫ সালে জিয়া পুতুলকে নিয়ে পাকিস্তান চলে যান। সেখানে তার পোস্টিং হয়। সে সময় পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তারা পাকিস্তানেই ছিল। জিয়া যুদ্ধে অংশও নিয়েছিলেন। তিনি ‘খেমকারান' রণাঙ্গনের ‘বেদীয়ান'-এ যুদ্ধরত ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি ব্যাটালিয়নের কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন। তাঁর কোম্পানির নাম ছিল আলফা কোম্পানি। সে যুদ্ধে জিয়া বীরত্ব দেখিয়েছিলেন।
যুদ্ধের কথা জানিয়ে বেগম খুরশীদ জাহান বলেন, ওই সময় পুতুল এবং জিয়ার খবর নেওয়ার জন্য আমরা প্রায়ই পাকিস্তানে ফোন করতাম। পুতুল তাদের কুশলাদি জানাত। আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করতাম কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি-না। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সে ছিল দৃঢ় মনের। বলত, তোমরা অযথা ভেব না। পাকিস্তানের বান্নো এলাকায় পুতুল থাকত।
পাকিস্তান থেকে ফেরার স্মৃতি বর্ণনা করে বেগম তৈয়বা মজুমদার জানান, পুতুল ওর শ্বশুরের খুব প্রশংসা করত। বলত ওর শ্বশুর ওকে খুব আদর করত। এটা কিনে দিত, ওটা কিনে দিত। ওর শাশুড়ি যে বেতারে গান করতেন তা বলত। জিয়া ও পুতুল ছিল মধুর দম্পতি। ওরা কেউ কারো সম্পর্কে কোনো দিন অভিযোগ করেনি।

জাকের হোসেন