বিদায় ‘রাজনীতির ধ্রুবতারা’
গৃহিণী থেকে রাজপথে নেমেছেন। চষে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিটি জনপদ, গ্রাম থেকে গ্রাম। সব প্রতিবন্ধকতা দূরে ঠেলে বেছে নিয়েছিলেন গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। হয়েছিলেন জাতির অভিভাবক। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য তাঁর আত্মত্যাগ তাঁকে দেশের ‘রাজনীতির ধ্রুবতারা’য় পরিণত করে। তিনি খালেদা জিয়া।
দেশের মানুষকে কাঁদিয়ে আজ বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দেশের রাজনীতির ধ্রুবতারা খালেদা জিয়া। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান হলো।
খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানাতে কোটি মানুষের ঢল নামে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ পুরো রাজধানীজুড়ে। ঢাকা যেন পরিণত হয় ‘জানাজার নগরী’তে। দল-মত ও আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন খালেদা জিয়া। এক মহাকাব্যিক প্রস্থানে একটি কফিনের পাশে যেন পুরো বাংলাদেশ।
খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরবসহ ঢাকাস্থ ৩২টি দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা, যার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্পিকার ছিলেন।
দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের এই উপস্থিতিই বলে দেয়, খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রী নন, এই জাতি ও রাষ্ট্রের নেতা।
খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৫টি নির্বাচনে ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করে সবকটিতেই জয়ী হয়েছিলেন। কখনও ভোটে হারেননি।
১৯৮১ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউর রহমান এক রক্তাক্ত সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হবার পর তার স্ত্রী খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। গৃহবধূ থেকে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন একজন ঝানু রাজনীতিবিদ। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি জিয়াউর রহমানের গড়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নেন খালেদা জিয়া। পরে দলের প্রধান হিসেবে তখনকার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে কাটিয়ে দেন ৯ বছর। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর সাধারণ নির্বাচনে চমকপ্রদ বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়েন তিনি। মুসলিম বিশ্বে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সরকার প্রধান। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকার জন্য তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’র খেতাব পান। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ‘সফল’ ব্যক্তি হওয়ায় অনুসারীরা তাকে ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠায় তৎকালীন সরকার। কারাগারে গিয়ে ধীরে ধীরে শরীরে দানা বাঁধতে শুরু করে রোগ। কিন্তু তাঁর যে আপসহীন ভূমিকা, মাথা নোয়াবার নয়। তাই তো নিজের পথে ছিলেন অবিচল, করেননি আপস। আর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।
কখনও দেশের বাইরে যেতে চাননি খালেদা জিয়া। তিনি বলেছিলেন, 'আমি দেশ ছেড়ে, দেশের মানুষকে ছেড়ে কোথাও যাব না। এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। দেশের বাইরে আমার কিছু নেই, কোনো ঠিকানাও নেই।'
এক-এগারো থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে খালেদা জিয়া তার কথা রেখেছেন। এমনকি দেশে ফ্যাসিস্টমুক্ত হওয়ার পরও। সুযোগ ছিল বিদেশে গিয়ে জীবন কাটানোর, কিন্তু সেই পথ বেছে নেননি। গোটা দেশ দেখলো তা। জাতিও বিনিময়ে ভালোবাসা দিতে ভোলেননি।
জীবনের শেষ মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠা খালেদা জিয়া যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপাসনের পরিচয় ছাপিয়ে গেছেন, তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় মানুষের এই জনস্রোত। একজন রাজনীতিবিদের জীবন কতটা বর্ণাঢ্য হলে এতটা ভালোবাসা মেলে, তার উত্তর উপস্থিত মানুষের মাঝেই রয়েছে।
খালেদা জিয়া অমর হয়ে থাকবেন এই বাংলার মানুষদের মানসপটে। তিনি থাকবেন বাংলার ধানের শীষে। যেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা, রাজনৈতিক সংগ্রামের গল্প, দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাওয়ের স্লোগান।

মাহমুদুল হাসান