‘শরীর আর সইছে না বাহে—একটা কম্বল দাও’
হিমেল বাতাস আর ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামের জনজীবন। রাত নামলেই শীতের তীব্রতায় কাঁপছে দরিদ্র শিশু, বৃদ্ধ ও দিনমজুর পরিবারগুলোর মানুষ। তাদের শুধু একটাই আবেদন—‘একটা কম্বল দাও বাহে’। কিন্তু সেই চাওয়া শোনার যেন কেউ নেই।
জেলার নদীবেষ্টিত চর এলাকায় রাত গভীর হলে খোলা আকাশের নিচে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে মানুষগুলো। অনেক শিশু আগুনের পাশে বসেই ঘুমিয়ে পড়ছে। কাজ না থাকায় দিনমজুরদের আয় বন্ধ, ফলে শীত মোকাবিলায় নিজেদের সামর্থ্যও নেই।
জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ২৪ লাখ মানুষের মধ্যে ১৭ লাখই দরিদ্র। এর মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ চলমান শীতে ৯ উপজেলায় মাত্র ২২ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য বলে দাবি স্থানীয়দের।
ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত যাত্রাপুর ইউনিয়নে প্রায় ৩৬ হাজার মানুষের বসবাস, যার মধ্যে অন্তত ২৫ হাজার মানুষ দরিদ্র। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বলেন, ‘সরকার থেকে মাত্র ১০০টি কম্বল পেয়েছি। এই কম্বল দিয়ে হাজারো মানুষের কান্না থামানো সম্ভব নয়।’
ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গোয়ালপুরী চরে প্রায় তিন হাজার ৫০০ মানুষের জন্য মাত্র পাঁচটি কম্বল বরাদ্দ এসেছে জানিয়ে ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এই পাঁচটা কম্বল কাকে দেব—এই চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।’
জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘চরের মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগ—সবই সীমিত। তার ওপর এই তীব্র শীত তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু আরও বলেন, ‘ভারত সীমান্তঘেঁষা অনেক চরে সরকার ও এনজিওর তৎপরতা চোখে পড়ে না। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে মানবিক বিপর্যয় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসের কারণে শীত আরও তীব্র অনুভূত হচ্ছে এবং এই প্রবণতা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন জানান, শীতবস্ত্র কেনার জন্য সরকার ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং দ্রুত আরও কম্বল বিতরণ করা হবে।
চর রাজিবপুরের বৃদ্ধ সুখিতন বলেন, ‘শরীর আর সইছে না বাহে—একটা কম্বল দাও।’

এনামুল হক, কুড়িগ্রাম (সদর-রাজারহাট)