এনসিপির ৩৬ দফা ইশতেহার, তারুণ্যে ভরসা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩৬ দফার ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ প্রকাশ করেছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে এই নির্বাচনি ইশতেহারে প্রাধান্য পেয়েছে পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নাগরিকদের ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা, সিংহভাগ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, ডিজিটাল হেলথ কার্ড প্রবর্তন, সশস্ত্র বাহিনীর জন্য রিজার্ভ ফোর্স তৈরি করার মতো নানা প্রতিশ্রুতি। এনটিভি অনলাইনের পাঠকদের জন্য এই নির্বাচনি ইশতেহারের চুম্বক অংশগুলো তুলে ধরা হলো-
ভোটাধিকারের বয়স হবে ১৬ বছর
গণতন্ত্রকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল করতে এনসিপি ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করবে। এই অবস্থান এনসিপির পক্ষ থেকে সংস্কার কমিশনে দেওয়া প্রস্তাবনা থেকেই তুলে ধরা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সরকারি সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে তরুণদের জীবনযাত্রায়। ভোট প্রদানের বয়স ১৬ করা হলে তরুণরা দ্রুত নাগরিক সিদ্ধান্তগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং এতে বেশি গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হবে।
বছরে ১৫ লাখ দক্ষ প্রবাসী কর্মী তৈরি
ইশতেহারে প্রতি বছর ন্যূনতম ১৫ লাখ নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রবাসী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ, প্রি-ডিপারচার সাপোর্ট, স্বল্প খরচে রেমিট্যান্স সেবা নিশ্চিত করাসহ আধুনিক ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করা হবে এই কাজে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশ যাত্রার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য সহজ শর্তে শিক্ষাঋণ প্রদান করা হবে।
পাঁচ বছরে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ
এনসিপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির কমপক্ষে ৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখার কথা জানিয়েছে দলটি। মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামোর আওতায় একটি রোডম্যাপ প্রদান করা হবে যাতে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ টেকসই, পরিকল্পিত ও ফলপ্রসু হয়। এছাড়া আগামী পাঁচ বছরে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে ও মানভিত্তিক জাতীয়করণের আওতায় আনা হবে।
উচ্চশিক্ষায় ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ
উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ বাাড়াতে স্নাতক পর্যায়ে পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ বা থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে। এ প্রক্রিয়ায় প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই প্রোগ্রাম চালু করা হবে এবং ধাপে ধাপে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে তা বাস্তবায়িত করা হবে। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে শুরুর দিকে ইন্টার্নদের বেতন খরচের ওপর প্রণোদনা প্রদান করা হবে। এছাড়া রিজার্ভ ফোর্সের প্রাইমারি ট্রেনিংয়ে অংশ নিলে তা তিন মাসের ইন্টার্নশিপ হিসেবে গণ্য হবে।
প্রতিটি জেলা হাসপাতালে থাকবে আইসইউ-সিসিইউ ইউনিট
ইশতেহারের স্বাস্থ্য বিষয়ক অংশে বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ এবং সিসিইউ ইউনিট, ডায়ালাইসিস ইউনিট ও ট্রমা কেয়ার ইউনিটের মাধ্যমে সার্বক্ষাণিক স্বাস্থসেবা নিশ্চিত করা হবে। ত্রিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের জন্য ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার, অ্যাজমা ও ক্যানসার রোগের স্ক্রিনিং ন্যাশনাল ইন্সুরেন্সের আওতায় আনা হবে।
এনআইডি ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ কার্ড ও ন্যাশনাল হেলথ ইন্সুরেন্স
ইশতেহারে বলা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবার মৌলিক দুর্বলতা হলো রোগীর চিকিৎসা ইতিহাসের বিচ্ছিন্নতা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি এবং এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে গেলে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়া। এই কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ও গভর্ন্যান্স ভিত্তিক অবকাঠামো তৈরি জরুরি। এই লক্ষ্যে এনআইডি লিঙ্কড ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড (ইএইচআর) সিস্টেম চালু করা হবে। এতে প্রতিটি নাগরিকের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য নিরাপদভাবে ডিজিটালি সংরক্ষণ করা যাবে।
নারীদের যাতায়াতে এলাকাভিত্তিক শাটল সার্ভিস
নারী ও কন্যাশিশুদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শাটল সার্ভিস চালু করা হবে। এই সার্ভিস হবে এলাকাভিত্তিক ও অনডিমান্ড, যেখানে প্রশিক্ষিত ড্রাইভার ও সহকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে যাত্রীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। পাইলট প্রকল্পে রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, বারিধারা, উত্তরার মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে।
রিজার্ভ ফোর্স
গণপ্রতিরক্ষা দর্শনের ভিত্তিতে দেশের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিবছর ৩০ হাজার তরুণকে বেসিক অস্ত্র ও মিলিটারি ট্যাকটিক্স ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তিন বাহিনীর জন্য কমব্যাট-রেডি ও দুর্যোগ পরিস্থিতির জন্য তৈরি করা হবে। এই ট্রেনিং হবে ১০ সপ্তাহ মেয়াদি। এছাড়া রিজার্ভিস্টরা বছরে দুই সপ্তাহ করে রিফ্রেশার ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো প্রচলিত বাহিনীর দ্বিগুণ আকারের রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত করা।
সেনাবাহিনীতে ড্রোন ব্রিগেড গঠন
ইশতেহারে বলা হয়েছে, কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস টু এয়ার মিসাইল (এসএএম) ব্যাটারি অধিগ্রহণ করা হবে। এরপর দূরবর্তী লক্ষ্যমাত্রার মিসাইল যুক্ত করা হবে।
এছাড়া সর্বাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি অধিগ্রহণ, দেশি সামরিক গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে একটি ইউএভি (ড্রোন) ব্রিগেড গঠন করা হবে। এক্ষেত্রে ড্রোন বিষয়ক বর্তমান উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া হবে।
ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে, হাজারো শহীদদের আত্মত্যাগ ও আহতদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশ একটি বড় দায়িত্ব দিয়েছে এনসিপিকে। দলটি সেই ঐতিহাসক দায়িত্ব ও জনআকাঙ্ক্ষাকে সামনে রখে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মাঠে রয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকারের অংশ হলে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে এই ইশতেহার বাস্তবায়নে কাজ করবে এনসিপি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক