‘দেশের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততার বিকল্প নেই’
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশ এখন আর কেবল সংকট থেকে উত্তরণের গল্প নয়। বাংলাদেশ আজ অমিত সম্ভাবনার দেশ। সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততার বিকল্প নেই।
আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টা ১৫ মিনিটে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েরা অসীম সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। এটি সাহসী, সৃজনশীল, উদ্যমী তরুণদের দেশ। তাদের দরকার উপযুক্ত শিক্ষা, বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ এবং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা—যেখানে মেধা ও পরিশ্রম ও সততার মূল্য আছে। সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক দক্ষ, কর্মঠ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীর প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। আর বাংলাদেশে আছে কর্মক্ষম বিপুল তরুণ সম্প্রদায়।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা যদি এই বৈশ্বিক চাহিদা পূরণে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তাহলে জাপান, কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ সবাই চাইবে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের শ্রম, মেধা ও সৃজনশীলতা ব্যবহার করতে। আমরা হয়ে উঠতে পারি তাদের জন্য পছন্দের একটি নির্ভরযোগ্য দক্ষ জনশক্তি সরবরাহকারী দেশ।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমাদের খোলা সমুদ্র কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়—এটি বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার উন্মুক্ত দরজা। নেপাল, ভুটান ও সেভেন সিস্টার্সকে নিয়ে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, বাণিজ্যিক চুক্তি ও শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশের সুযোগের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে একটি বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার শক্তিশালী ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের বন্দরগুলোর দক্ষতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেবার জন্য সেরা আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির কাজে অনেক এগিয়ে এসেছি। এর দক্ষতা বাড়াতে না পারলে আমরা অর্থনৈতিক অর্জনে পিছিয়ে যাব।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও শুল্ক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এই চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক সুবিধা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করার জন্য একটি কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্কভার রেসিপরোকাল ট্যারিফ ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে কমে এসেছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই চুক্তির একটি বিশেষ দিক হলো—যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পণ্যে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা। এটা একটা মস্ত বড় সুবিধা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশি পোশাক আরও কম দামে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবে; যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারের ফলে আমাদের সরবরাহ চেইন আরও বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল হবে; এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে উচ্চমূল্যের ও উন্নতমানের পণ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেবে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত টেকসই, বৈচিত্র্যময় ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে জাপানের সঙ্গে সম্পাদিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি একটি ঐতিহাসিক ও কৌশলগত অগ্রগতি। এই অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল হলো উৎপাদন ও রপ্তানির বহুমুখীকরণ।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার ফলে অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স, রেলওয়ে সরঞ্জাম, গ্রিন টেকনোলজি এবং উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে যুক্ত হতে পারবে। এতে আমাদের ঝুঁকি কমবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলো আমাদের দেশে বিনিয়োগ করবে শুধু জাপানে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুবিধা গ্রহণ করার জন্য।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আমরা চীনের সাথে আমাদের উন্নয়ন সহযোগিতা গভীরতর করেছি। গত বছর মার্চে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকে আমরা দুদেশের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছি। ইতোমধ্যে তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুর্নবাসন প্রকল্পের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। নীলফামারিতে এক হাজার শয্যার একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরিতে দুদেশ একমত হয়েছে, এ কাজটি আমরা এগিয়ে নিতে পেরেছি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যে বাংলাদেশ শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর অর্থনীতি নয়—বরং দক্ষতা ও প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজনভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে। তবে আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে তিনটি বিষয়ের কোনো বিকল্প নেই: শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততা।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, অতীতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সীমাহীন দুর্নীতি, অসততা, অনিয়ম ও জালিয়াতিকে উৎসাহিত করা হয়েছিল। সেই সংস্কৃতি আমাদের পেছনে টেনে রেখেছিল, আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছিল। নতুন বাংলাদেশকে সেই পথ থেকে সরে আসতে হবে। আমাদেরকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে নিয়ম মানায়, প্রতিশ্রুতি রক্ষায়, মান বজায় রাখায়, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরকে দুর্নীতিমুক্ত করায়, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করায়।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক