কিশোরীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা, মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ৭
নরসিংদীর মাধবদীতে কিশোরীকে ধর্ষণ ও পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় মূলহোতা নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে নূরাকে গাজীপুর ও আলী হোসেনকে কিশোরগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।
এদিকে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা সালিশ বৈঠকের বিচারক মহিসাষুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করেছে সদর উপজেলা বিএনপি। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার দিনগত রাতে মাধবদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে এই ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিরা হলেন মামলার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নুরা, কিশোরগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা আলী। নুরা পেশায় একজন রিকশাচালক। এর আগে গতকাল দিনগত রাতে মহিসাষুরা ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য, সালিশ বৈঠকের বিচারক মহিসাষুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহাম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহাম্মদ দেওয়ান (৬৫), তার ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান (৩২), হোসেন বাজার এলাকার গাফ্ফার (৩৪)। ধর্ষক নুরার চাচাতো ভাই ও একই এলাকার এবাদুল্লাহ (৪০), মো. আইয়ুবকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে কিশোরীকে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে পরিকল্পিত ভাবে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ জেলাজুড়ে চাঞ্চলের সৃষ্টি করে। পরে ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সংঘঠন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী সদর আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন।
পুলিশ, নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা জানায়, নিহত কিশোরীর বাবা আশরাফ হোসেন শেরপুরের বাসিন্দা। মাধবদী এলাকায় একটি ট্রেক্সটাইল মিলে কাজ করেন। সম্প্রতি নিহত কিশোরীর মা ফাহিমা বেগমকে বিয়ে করেন। স্ত্রী, সৎ কন্যা ও ছেলেসহ মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়ায় বসবাস করতেন। গত ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জনের একটি দল এলাকা থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে ধর্ষণের বিচার চেয়ে কিশোরীর পরিবার মহিসাষুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহাম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহাম্মদ দেওয়ানের দারস্থ হন। সেখানে ধর্ষক ও তাদের সহকর্মীরা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রফাদফার চেষ্টা করেন। ওই সময় রফদফা না হওয়ায় কিশোরীর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন সালিশ বৈঠকের বিচারক আহাম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহাম্মদ দেওয়ান।
এরপর গত বুধবার রাতে বাবা আশরাফ হোসেন তার কাজ শেষ মেয়েকে নিয়ে তার খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বড়ইতলা এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে আরও পাঁচজন তাদের গতি রোধ করেন। ওই সময় ধর্ষক নুরা নিহত কিশোরীর বাবার গলায় ছুরি ধরে জিম্মি করে ফেলে। এরপর তার কাছ থেকে কিশোরীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে পরিরেরর লোকজনসহ বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুজির পর না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান আশরাফ হোসেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে একই এলাকার একটি সরিষাক্ষেত থেকে গলায় ওড়না পেচানো মরদেহটি দেখতে পায় স্থানীয়রা। পরে মাধবদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। আজ দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ মাধবদীতে একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আরও পড়ুন : ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় কিশোরীকে হত্যা, ছাত্রশিবিরের উদ্বেগ প্রকাশ
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে ধর্ষক নূর মোহাম্মদ ওরফে নুরাকে প্রধান আসামি করে নয়জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা করেন কিশোরীর মা। এ ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে। আদালতের বিচারক আগামী রোববার শুনানির দিনে ধার্য করেন। পরে গ্রেপ্তারকৃতদের কারাগারে পাঠানো হয়।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী সদর আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন বলেন, ধর্ষক ও হত্যাকারীসহ অপরাধীদের জন্য আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। অপরাধী যে দলেরই হোক তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইতোমধ্যেই মহিসাষুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়াকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে সদর উপজেলা বিএনপি।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, ধর্ষণের ঘটনায় নয়জনকে আসামি করে মামলার পর মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন মহিষাসুর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহমাদ আলী দেওয়ান, তার ছেলে ইমরান দেওয়ান, ধর্ষক নূরার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব এবং ধর্ষক এবাদুল্লাহ। এবায়দুল্লাহ জামায়াত ইসলামীর সক্রিয় কর্মী।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, গত ১০ ফ্রেব্রুয়ারি মেয়েটিকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার তখন পুলিশের কাছে আসেনি। থানায় এলে এ ঘটনাটা ঘটত না। তবে হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে মাঠে নামে। চার ধর্ষকসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিশ্বজিৎ সাহা, নরসিংদী