শৈশবের সেই ঈদ হারানো সময়ের এক রঙিন মহাকাব্য
বেহেশতে যদি কখনও কিছু চাওয়ার সুযোগ পাই, আমি বারবার সেই শৈশবের ঈদটাই চাইব। অথবা চাইব আমার সেই গ্রাম, আমার শৈশবের গ্রাম। এক বুক হাহাকার আর গভীর মমতা নিয়ে এভাবেই নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বলছিলেন এনটিভির সাংবাদিক মাহফুজ নান্টু।
আজকের ফাইবার অপটিক আর উচ্চগতির ইন্টারনেটের যুগে দাঁড়িয়ে আমরা হয়তো অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি সেই সহজ-সরল মাটির ঘরের ঈদ। যে ঈদে নতুন জামার চেয়েও বড় ছিল দাদার রাখা একটা বাসি জিলাপি কিংবা কদরের রাতের শরা সিন্নির স্বাদ।
শৈশবের সেই দিনগুলোতে ফেরার আকুতি জানিয়ে মাহফুজ নান্টু বলেন, ফিরে যেতে চাই সেই মাটির ঘরে, পেছনের সেই সরু পথটায়। যে পথ ধরে পুকুরপাড় পেরিয়ে চলে যেতাম জৈন্তা ক্ষেতে। সেখানে ডাহুক ডাকত, বক দাঁড়িয়ে থাকত, আর টুনটুনির ছোট ছোট বাসায় ছিল আমাদের রাজ্যের কৌতূহল। ভাইবোনদের সাথে দুপুরে পুকুরে ডুবোডুবি আর সন্ধ্যাবেলা উঠানে বসে কোরআন তিলাওয়াতের সেই দৃশ্যগুলো যেন আজ কেবলই রূপকথা।
স্মৃতির পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে ইতেকাফে বসা দাদার সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখ। টিউবওয়েল থেকে কলসভর্তি পানি নিয়ে দাদার কাছে গেলে তিনি সযত্নে তুলে রাখা গতকালের ইফতারের সেই পুরোনো জিলাপি আর দুটো খেজুর নাতির হাতে ধরিয়ে দিতেন। সেই জিলাপির স্বাদ যেন আজকের নামি-দামি রেস্তোরাঁর যেকোনো খাবারকে হার মানায়। কদরের রাতে নফল নামাজের প্রতিযোগিতা আর নারকেলের টুকরো বেছে বেছে শরা সিন্নি খাওয়ার আনন্দ ছিল এক অনন্য উৎসব।
তখন ২৭ বা ২৮ রমজান এলেই দরজায় কড়া নাড়ত ঈদ। আব্বুর বেতন না হলেও মন খারাপ হতো না; আগের বছরের পাঞ্জাবিটাই কয়লার ইস্ত্রি দিয়ে নতুন করে সাজিয়ে রাখা হতো। বিটিভিতে যখন ঘোষণা আসত- ‘শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে’, তখন মনে হতো আকাশভরা আনন্দ নেমে এসেছে মাটির ঘরটাতে। বালিশের নিচে রাখা সেই পাঞ্জাবিটা বারবার বের করে দেখা আর শীতের ভোরে কাঁপতে কাঁপতে পুকুরঘাটে গোসল করার সেই স্মৃতি আজও অমলিন।
দেড় মাইল দূরের ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া, ফেরার পথে কবরস্থানে দাঁড়িয়ে দোয়া করা এবং ঘরে ফিরে মায়ের হাতের নিজেদের জমির ধানের সুগন্ধি পোলাও আর মোরগের আলুর ঝোল খাওয়া- এসবই ছিল এক একটি মহোৎসব। পকেটে জমা দুই-পাঁচ টাকার সালামি নিয়ে নিজেকে মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।
সময় বদলেছে, মাটির ঘর আজ দালান হয়েছে, পুকুরপাড় হয়তো ভরাট হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের মনের গহীনে সেই শৈশবের গ্রামের ঈদ আজও বেঁচে আছে। হাজার বছর পেরিয়ে একদিন যদি মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায়, তবে সেই রঙিন শৈশবটাই হবে পরম কাঙ্ক্ষিত উপহার।
লেখক : এনটিভির কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি মাহফুজ নান্টু।

মাহফুজ নান্টু, কুমিল্লা