আবু সাঈদ হত্যায় ৩০ আসামির কে কোন দণ্ডে দণ্ডিত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই রায় দেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন– বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আজ দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে রায় পড়া শুরু হয়ে চলে ১টা পর্যন্ত। রায়ের দিন গ্রেপ্তারকৃত ছয়জন আসামি উপস্থিত ছিলেন।
রায় ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর আব্দুস সোবহান তরফদার ও প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, প্রসিকিউটর মঈনুল করীম, ব্যারিস্টার শাঈখ মাহাদী, তারেক আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো, আজিজুর রহমান দুলুসহ আরও কয়েকজন। পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী সুজাদ মিয়া।
রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান রায়ের শুরুতে বলেন, আজ যার রায় ঘোষণা করা হবে, তিনি জুলাই গণআন্দোলনের প্রথম শহীদ। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। ভেবেছিলেন তার সামনে যারা ছিল, তারা সবাই মানুষ। ভেবেছিলেন তার কিছু হবে না। কিন্তু তারা মানুষ ছিল না। তারা অমানুষ হয়ে গিয়েছিল।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এ মামলার সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শুরু হয়।
রায়ে তিনজনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তারা হলেন- সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব। এ ছাড়া ২৪ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত সাতজন হলেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
অন্যদিকে সাতজনের পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে। তারা হলেন- আরপিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, ছাত্রলীগের রংপুর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন।
তিন বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- বেরোবির সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল।
এছাড়া এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু ও সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়ার দু’বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৩০ আসামির মধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেন— এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ। তাদের সাইকে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বাকি আসামিরা পলাতক আছেন।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ সাক্ষ্য দিয়েছেন ২৫ জন। তারকা সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এ মামলার ৩০ আসামির আলাদা আলাদা দায়। তার জবানবন্দিতে নিজের তদন্তে পাওয়া ৩০ আসামির সবার ব্যক্তিগত দায় ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক