অভাব দূর করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন তারা
বাসের কয়েকশ টাকা ভাড়া বাঁচাতে পণ্যবাহী ট্রাকে সওয়ার হয়েছিলেন ১৩ জন শ্রমিক। লক্ষ্য ছিল কুমিল্লা ও ফেনী অঞ্চলে ধান কেটে পরিবারের অভাব দূর করা। কিন্তু সেই সঞ্চয়ের চেষ্টাই কাল হলো তাদের জীবনে। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে চালবোঝাই ট্রাক উল্টে প্রাণ হারিয়েছেন সাত শ্রমিক, আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে পথে বের হওয়া মানুষগুলো এখন শুধুই নিথর দেহ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দির হাসানপুর এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রামগামী চালবোঝাই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে নিচে পড়ে গেলে ওপরে থাকা ১৩ জনই নিচে চাপা পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন।
দুর্ঘটনার পর কুমিল্লা হাইওয়ে ক্রসিং থানার লাশঘরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। নিহত সুমনের ভাই সামিউল ইসলাম একটি বেগুনি রঙের টি-শার্ট হাতে নিয়ে বিলাপ করছিলেন। তিনি বলেন, ‘এই জামাটা আমিই কিনে দিয়েছি। সুমন আর কোনোদিন এটা পরবে না। প্রতিবছর ধান কাটার মৌসুমে সে আমার কাছে আসত, এবার এসে জীবনটাই হারালো।’
নিহতদের স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার ভাইগড় গ্রাম থেকে এই শ্রমিকরা সোমবার রাতে রওনা হয়েছিলেন। নিহত সোহরাব হোসেন এবারই প্রথম শ্রমিকের কাজ করতে বাইরে বেরিয়েছিলেন। স্ত্রী চম্পা আক্তার নিষেধ করলেও দুই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি রওনা হন, যা শেষ পর্যন্ত তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়াল।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) দাউদকান্দি শাখার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দিনাজপুর থেকে কুমিল্লা আসতে বাসে জনপ্রতি প্রায় দেড় হাজার টাকা লাগে। কয়েকশ টাকার বিনিময়ে অভাবী এই মানুষগুলো ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকে উঠেছিলেন। পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন নিষিদ্ধ থাকলেও নজরদারির অভাবে এমন প্রাণহানি ঘটছে।” আহতদের বরাত দিয়ে তিনি আরও জানান, মুন্সিগঞ্জের মেঘনা টোলপ্লাজা পার হওয়ার পর চালকের পরিবর্তে হেল্পার গাড়ি চালাচ্ছিলেন। এর ১৫ কিলোমিটার পরেই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারায়।
ঘটনার পর হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার শাহিনুর আলম খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, সড়কের অবস্থা ভালো থাকলেও চালকের দক্ষতা, ক্লান্তি বা লাইসেন্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো তদন্ত করা হচ্ছে। এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের দাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে চাওয়া এই শ্রমিকদের করুণ মৃত্যু আবারও দেশের সড়ক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্যের রূঢ় বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

মাহফুজ নান্টু, কুমিল্লা