ফিলিং স্টেশনগুলোতে উধাও দীর্ঘ সারি, অলস সময় পার করছেন কর্মচারীরা
রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে হঠাৎ করেই ক্রেতার দীর্ঘ লাইন কমে গেছে। কয়েকদিন আগেও যেখানে তেল নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হতো, সেটি এখন উধাও হয়ে গেছে। ক্রেতার ভিড় না থাকায় এখন অনেক ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন।
আজ বুধবার (২৯ এপ্রিল) নীলক্ষেত (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন) এলাকার কিউ জে সামদানি অ্যান্ড কোং ফিলিং স্টেশনে সরেজমিনে দেখা যায়, খোশ গল্পে মেতেছেন কর্মচারী হৃদয় ও সোহেল। একজন মোটরসাইকেল আরোহীকে তেল দিয়ে তাদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দেন নাহিদ। তাদের গল্পের কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নেই। ক্রেতা না থাকায় গল্প করছেন পাম্পের এই কর্মচারীরা।
হৃদয় বলেন, ‘তেল নিয়ে আমরা পাম্পে বসে আছি, কিন্তু কাস্টমার নেই। গত তিন ঘণ্টায় ৫০ জনেরও কম ক্রেতা তেল নিতে এসেছে।’
কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ এলাকার পূর্বাচল ট্রেডার্স ফিলিং স্টেশনের অপারেটর সাইফুল ইসলাম জানান, (বুধবার) দুপুর থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তিনি মাত্র দুজন মোটরসাইকেল চালককে অকটেন দিয়েছেন। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় আরেকজন মোটরসাইকেল চালক আসেন। তাকে তেল দিতে দিতে তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগেও এখানে তেল দিতে হিমশিম খেতে হতো। লম্বা লাইনের কারণে ভিড় লেগে যেত। এখন তেল নিয়ে বসে আছি, কিন্তু ক্রেতা নেই।’
মৎস্য ভবন এলাকার রমনা পেট্রোল পাম্প, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার, পূর্বাচল ট্রেডার্স, নীলক্ষেতের কিউ জে সামদানি অ্যান্ড কোং এবং এলিফ্যান্ট রোডের রহমান অ্যান্ড কোং পাম্প ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়। কোথাও ২ থেকে ৩টি মোটরসাইকেল, কোথাও সংখ্যায় একটু বেশি, তবে কোনো ফিলিং স্টেশনেই আগের মতো মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন নেই। ক্রেতারা আসা মাত্রই চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন।
বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমন হোসেন বলেন, ‘ফুয়েল পাসের মাধ্যমে তেল নিয়েছি, লাইনে তেমন ভিড় ছিল না। প্যানিক কমে যাওয়ায় লাইনও কমে গেছে। সরবরাহ বাড়ানোর কারণেও লাইন কমতে পারে।’
পাম্প কর্তৃপক্ষ ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হঠাৎ করে লাইন কমে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমে যাওয়া, জ্বালানি তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং ফুয়েল পাস ব্যবস্থা চালু হওয়া।
গতকাল জ্বালানি বিভাগ এক বার্তায় রাজধানীর ১১টি পাম্পে বাধ্যতামূলকভাবে কিউআর কোডভিত্তিক ফুয়েল পাস ব্যবস্থা চালু করে।
এ ছাড়া গত ২১ এপ্রিল জ্বালানি তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি করে সরকার। ডিজেল ও পেট্রোলের সরবরাহ ১০ শতাংশ এবং অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। এর পর থেকেই মূলত আতঙ্ক কমতে থাকে। পাশাপাশি ক্রেতাদের লাইনও কমতে থাকে।
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও রমনা পেট্রোল পাম্পের মালিক নাজমুল হক বলেন, ‘মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমে যাওয়ায় পাম্পগুলোতে আর লাইন নেই। সরবরাহ বাড়ানোর ফলেও এই পরিবর্তন এসেছে। আমরা শুরু থেকেই সরকারকে বলে আসছিলাম, সরবরাহ বাড়ালে লাইন থাকবে না। এখন সেটাই হয়েছে।’
মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংকট শুরুর পর থেকেই সরকার একাধিকবার জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। তবে, সে সময় জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্কের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে তেল সংগ্রহের জন্য মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা দিতে থাকে।
সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে ফুয়েল পাসে নিবন্ধনের জন্য কিছুটা ভিড় দেখা গেছে। বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে সেখানে প্রায় ৫০ জন মোটরসাইকেল চালককে পাওয়া যায়। তারা তেল নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। দিন কয়েক আগেও এখানে তেলের জন্য মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ সারি দেখা যেত। তবে, এই পাম্পে ফুয়েল পাস ছাড়া মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িতে তেল দেওয়া হচ্ছে না।
সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের হেড অব বিজনেস অপারেশন হেমোলাল মন্ডল (হিমালয়) বলেন, ‘সরকার সরবরাহ বাড়িয়েছে। আমরাও মানুষের চাহিদামতো দিচ্ছি। মানুষের মাঝে যে আতঙ্ক ছিল, তা কমেছে। ফলে, লাইন একদম নেই বললেই চলে। এ ছাড়া আমরা ফুয়েল পাস ছাড়া তেল না দেওয়ায় লাইন কমে গেছে।’
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, গতকাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি মোটরসাইকেল ফুয়েল পাসে নিবন্ধিত হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার। দিন দিন আবেদন বেড়েই চলছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)