চড়া সুদের ঋণে আবাদ করা ধান নিয়ে কৃষকের হাহাকার
হাওর ও সমতলের জেলা নেত্রকোনার কৃষকের কষ্টের ফলানো সোনালী ধান এখন যেন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টিতে জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, কেন্দুয়া, আটপাড়া ও সদর উপজেলার কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার হাওরাঞ্চলে ইতোমধ্যে ১১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তব ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। কৃষি বিভাগ হাওরে ৭১ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করলেও চোখের সামনে মাঠের পর মাঠ কাঁচা-পাকা ধান এখনও পানির নিচে পচতে দেখে দিশেহারা প্রান্তিক কৃষকরা। চড়া সুদে নেওয়া ঋণ আর শ্রমিকের অভাবে কৃষকের স্বপ্ন এখন কেবল হাহাকারে পরিণত হয়েছে।
জেলার বিভিন্ন হাওর পাড়ে অনেক কৃষক কষ্ট করে ধান কেটে তুললেও সময়মতো শুকাতে ও সংরক্ষণ করতে না পারায় সেই ধান স্তূপাকারে পচে যাচ্ছে। অনেক স্থানে উঠানে বা গোলাঘরের পাশে জমে থাকা ধানে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। চলতি মৌসুমে ধান কাটার জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, আর যারা আছেন তাদের মজুরি সাধারণ কৃষকের সামর্থ্যের বাইরে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সময়মতো ধান মাড়াই করাও সম্ভব হচ্ছে না।
মেদনী ইউনিয়নের বাসিন্দা ভুক্তভোগী কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ মণ ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন ছিল। এখন সেই ধানই শ্রমিক সংকটে কাটতে না পারায় চোখের সামনে পচে যাচ্ছে। এত কষ্টের ফসল এভাবে নষ্ট হবে কখনও ভাবিনি। চড়া সুদে নেওয়া ঋণ আর শ্রমিকের অভাবে দুশ্চিন্তায় আছি।
নেত্রকোনার প্রধান নদী সোমেশ্বরী, ধলেশ্বরী ও মগড়ার পানি বৃদ্ধি আপাতত অপরিবর্তিত থাকলেও পূর্বধলার জারিয়া পয়েন্টে কংস নদী এবং খালিয়াজুরিতে ধনু নদের পানি বৃদ্ধি আজও অব্যাহত রয়েছে। নদীর পানি উচ্চ অবস্থানে থাকায় ফসল রক্ষার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। রোদ উঠার সুযোগে কৃষকরা বাড়ির উঠান, রাস্তা ও খোলা জায়গায় ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জরুরি সরকারি হস্তক্ষেপ, বিশেষ প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে নেত্রকোনার আটপাড়ার সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী ক্ষতিগ্রস্ত হাওর অঞ্চল পরিদর্শন করে কৃষকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি কৃষকদের অভিযোগগুলো শোনেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি প্রণোদনার আশ্বাস দেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আমিনূল ইসলাম জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, তবে আবারও বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভজন দাস, নেত্রকোনা