অবহেলায় পর্যটক টানতে পারছে না মহাকবির স্মৃতিবিজড়িত ‘মধুপল্লী'
‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে,
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে’
বাংলা সাহিত্যে এই অমর পঙক্তিমালা যাঁর স্মৃতিকে ঘিরে আবর্তিত, সেই কপোতাক্ষ নদ আজ মৃতপ্রায়। আর অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ির ঐতিহাসিক ‘মধুপল্লী’ ২৮০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেও তা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। দৃশ্যমান ও পরিকল্পিত উন্নয়নের অভাবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা চরম ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে ফিরে যায়।
যশোর শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মধুপল্লীতে রয়েছে কবির দ্বিতল জন্মভিটা, মধুসূদন জাদুঘর, লাইব্রেরি এবং সাগরদাঁড়ি পর্যটনকেন্দ্র। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর মহাকবির বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করলেও দর্শনার্থীদের জন্য ন্যূনতম সুবিধার অভাব এখানে স্পষ্ট।
দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী এখানে এলেও বিনোদনের কোনো সুব্যবস্থা নেই।
খুলনা থেকে সপরিবারে আসা দর্শনার্থী আজিজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দূর থেকে এখানে ঘুরতে এলে থাকা-খাওয়ার ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। বাচ্চাদের খেলাধূলার মতো কোনো জায়গা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে যশোর বা খুলনা শহরে গিয়ে থাকতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টকর।’
ঐতিহাসিক দত্তপুকুরপাড়টি এখনও ভালো করে বাঁধানো হয়নি। পুরোনো পাঁচ-ছয়টি আমগাছের গোড়া বাঁধানো কিংবা দর্শনার্থীদের বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
মহাকবির আবেগের কপোতাক্ষ নদটি সংস্কারের পাশাপাশি সাতক্ষীরার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে একটি দৃষ্টিনন্দন ব্রিজের দাবি স্থানীয়দের।
প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে এখানে ‘মধুমেলা’ অনুষ্ঠিত হয়। তখন মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হলেও বছরজুড়ে স্থবির থাকে এই এলাকা।
মধুসূদন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কবি খসরু পারভেজ বলেন, ‘মধুপল্লীতে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মধুপল্লীর ভেতর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পোস্ট অফিস সরিয়ে সেখানে পুরোনো বিল্ডিং সংরক্ষণ করা জরুরি। মধুপল্লী ও মধুপল্লীর বাইরের অবস্থানকে ঘিরে একটি মনোরম পর্যটনকেন্দ্র এখানে গড়ে উঠতে পারে। পর্যটকদের আবাসিক সংকটের জন্য জেলা পরিষদ থেকে ডাকবাংলো নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যটন করপোরেশন কর্তৃক নির্মিত ছোট একটি মোটেল অসংখ্য পর্যটকের তুলনায় তা অপ্রতুল।
সাগরদাঁড়ি মাইকেল মধুসূদন দত্তবাড়ির সহকারী কাস্টোডিয়ান মো. হাসানুজ্জামান জানান, মধুপল্লীর ক্যাম্পাসটি উত্তর দিকে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। জমি অধিগ্রহণ করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, পুকুরঘাট বাঁধানো এবং কবির আঁতুরঘরকে নান্দনিক অবকাঠামোয় রূপ দেওয়া সম্ভব হলে এটি আরও দর্শনার্থীবান্ধব হবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, চলতি অর্থবছর কিছু সংস্কারকাজ হয়েছে এবং আগামীতেও হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় আনসার সদস্য নিয়োজিত আছে। তবে পুরো মধুপল্লী ঘিরে একটি বৃহৎ ‘কমপ্লেক্স’ তৈরির প্রকল্প ভাবনা আমাদের রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে পর্যটকদের পদচারণা ও সুযোগ-সুবিধা আরও বৃদ্ধি পাবে।

ইনামুল হাসান, যশোর (মনিরামপুর-কেশবপুর)