কবিবাড়ি
কপোতাক্ষের তীরে মধুকবির খোঁজে
বাংলার আকাশ,বাতাস আর মাটির পরতে পরতে মিশে আছে সাহিত্যের সুধা। কিন্তু কিছু স্থান এমন থাকে, যা কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র নয়, বরং হয়ে ওঠে একটি জাতির আবেগ আর ইতিহাসের মিলনস্থল।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার শান্ত-স্নিগ্ধ গ্রাম সাগরদাঁড়ির সেই ঐতিহাসিক 'কবিবাড়ি' তেমনই এক তীর্থস্থান। যেখানে কপোতাক্ষ নদের কলতানে প্রতিধ্বনিত হয় বাংলা মহাকাব্যের জনক মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর সৃষ্টি।
বিদেশের জৌলুস আর যান্ত্রিকতার মাঝে বসেও যে মহাকবি তাঁর শৈশবের এই মাটির ঘ্রাণ খুঁজে বেড়াতেন, সেই ভিটা আজও দাঁড়িয়ে আছে এক জীবন্ত ইতিহাস হয়ে। প্রাচীন অট্টালিকার লাল ইটের পরতে যেন আজও লেগে আছে এক কালজয়ী প্রতিভার পদচিহ্ন। প্রতিবছর শীতের পরশ নিয়ে যখন সাগরদাঁড়িতে মধুমেলা বসে, তখন এই বাড়িটি আর কেবল একটি দালান থাকে না, এটি হয়ে ওঠে অগণিত সাহিত্যপ্রেমীর মিলনমেলা। চলুন আজ ঘুরে আসি সেই স্মৃতিধন্য আঙিনায়, যেখানে মহাকবির শৈশব আর কপোতাক্ষের মিতালি আজও মানুষকে নস্টালজিক করে তোলে।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার একটি শান্ত গ্রাম সাগরদাঁড়ি। গ্রামের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে চিরচেনা কপোতাক্ষ নদ। এই নদের কলতানেই একদিন বড় হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার পথিকৃৎ, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। শত বছর পেরিয়ে গেলেও আজও সাগরদাঁড়ির বাতাসে যেন মিশে আছে তাঁর কবিতার ছন্দ।
যশোর শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে কেশবপুর উপজেলায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক জন্মভিটা। স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন এই দত্তবাড়ি এখন সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে একটি জাদুঘর। কবির বাড়ির পাশেই রয়েছে তাঁর প্রিয় কপোতাক্ষ নদ এবং সেই বিখ্যাত বাদাম গাছ, যার ছায়ায় বসে তিনি বিদেশের মাটিতে বসেও জন্মভূমির ঘ্রাণ খুঁজতেন।
লাল ইটের কারুকাজ করা বিশাল অট্টালিকা, প্রশস্ত আঙিনা আর পুরনো আমলের দরজা,জানলা। জাঁকজমকপূর্ণ সেই দত্তবাড়ির প্রতিটি ইট যেন মহাকবির শৈশবের সাক্ষী।
এই মহাপ্রতিভা যেখানে জন্মেছিলেন, বেড়ে উঠেছিলেন, সে স্থানটি ঘুরে দেখার বাসনা অনেকের মনেই রয়েছে। তবে সাগরদাঁড়ি নামে ছবির মতো গ্রামটিতে কীভাবে যাবেন, তা জানা না থাকায় অনেকেই সেখানে যাওয়া হয়ে ওঠে না। তাদের জন্য বলছি, এই শীতেই মহাকবির জন্মভিটা ঘুরে আসুন। কারণ, মহাকবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সেখানে সপ্তাহজুড়ে প্রতিদিনই লাখো মানুষের সমাগম ঘটে।
প্রতিবছর এই সময়ে যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে মধুকবির জন্মভিটায় আয়োজন করা হয় জমজমাট গ্রামীণ মেলার। মধুমেলা নামের এই আয়োজন চলে সপ্তাহজুড়ে। সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা প্রশাসন এই মেলার আয়োজন করে। ঐতিহ্যবাহী দত্তবাড়ির বিশাল আঙিনাজুড়ে গ্রামীণ হাজারো পণ্যের সমাহার তো থাকেই, সেই সঙ্গে থাকে যাত্রা, সার্কাস, আর মহাকবির জন্মভিটা ও তাঁর স্বজনদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র তো দেখবেনই। পল্লী কবি জসিমউদ্দীন, শামসুর রাহমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অনেক কবি-সাহিত্যিক এসেছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় এই মেলায়। মেলা চলাকালে ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকেও আসেন অনেক কবিভক্ত।
ঢাকা থেকে আপনি যশোর পৌঁছাতে পারেন তিনভাবে। সকাল-বিকেল বেসরকারি বিমান চলাচল করে। যে কোনো একটিতে চেপে বসলে ৪০ মিনিটেই আপনি পৌঁছে যাবেন যশোর। যেতে পারেন সড়ক পরিবহনে। সারা দিন-রাতই আপনি ঢাকা-যশোর, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-বেনাপোল, ঢাকা-সাতক্ষীরা রুটের গাড়ি পাবেন। সময় লাগবে পাঁচ ঘণ্টার মতো। আপনার হাতে যদি যথেষ্ট সময় থাকে এবং ট্রেন জার্নি যদি পছন্দ করেন, তাহলে যেতে পারেন ট্রেনেও।
রাতযাপনের জন্য যশোরে বেশকিছু ভালো মানের হোটেল রয়েছে। দেখেশুনে সেগুলোর একটিতে উঠে পড়তে পারেন। ফ্রেশ হয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন সাগরদাঁড়ির উদ্দেশে। যশোর শহর থেকে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে কেশবপুর উপজেলা সদরে। দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। বাস টার্মিনাল থেকে বাসে করে যেতে পারবেন। কেশবপুর থেকে সাগরদাঁড়ি যাওয়ার জন্য আপনি ভাড়ায় মোটরসাইকেল পাবেন।
পাবেন স্থানীয় কায়দায় তৈরি যন্ত্রযানও। তবে যদি কয়েকজন একসঙ্গে থাকেন, তাহলে যশোর শহর থেকেই ভাড়া করে নিতে পারবেন প্রাইভেট কার কিংবা মাইক্রো। এতে ফেরার বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে একটু রাত হলেও চিন্তা থাকবে না।

ফিচার ডেস্ক