বানারিপাড়ায় বার ভুঁইয়াদের স্মৃতি বিজরিত প্রাচীন স্থাপনা ধ্বংসের পথে
বরিশালে নির্মাণ শৈলীর অনন্য নিদর্শন ও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী একই আঙিনায় সাড়ে চারশত বছর আগে নির্মিত ২৪টি প্রাচীন স্থাপনা এখন ধ্বংসের মুখে। ইতোমধ্যে এখানকার ১৬টি স্থাপনা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। স্থাপনাগুলোর অন্যতম হচ্ছে সতীদাহ ভিটে, জমিদার বাড়ি, বালাখানা ও সরাইখানা। এসবের নির্মাণ শৈলী এখনো সৌন্দর্য পিপাসুদের দৃষ্টিনন্দন করে।
বরিশালের বানারিপাড়া উপজেলার বাইসারি এলাকার সাতানি গ্রামের দত্তবাড়ি মৌজার দুই জমিদারের বাড়ি এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় সাড়ে চারশত বছর আগের ইতিহাসের সত্য ভাষণ মানুষ এখনো জানতে এবং স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে আসেন এ বাড়িতে।
গাছগাছালীতে ঢাকা পড়ে গেছে এর চোখ জুড়ানো শৈলী কাজ। সতীদাহ প্রথার জীবন্ত সাক্ষী দিচ্ছে এর ভিটে। দুই জমিদার ভাইয়ের একক ভিটেতে এখনো উঁকি দিচ্ছে ২৪টি প্রাচীন স্থাপনার সর্বশেষ অংশটুকু। একসময় এখানে প্রতিদিন পুজো হতো। এখন বছরেও একটি পুজো হয় না। প্রাচীন এসব স্থাপনা দেখতে এখনো শিক্ষাবিদরা এই এলাকায় এসে ভিড় করেন। কিন্তু ইতিহাস জানবার বা জানাবার জন্য এখানে কেউই নেই। যারা আছেন তাদের কাছে এসব স্থাপনা যেন পাঁজর ভাঙ্গা পাথর।
জমিদারবাড়ির উত্তরপ্রজন্ম গোবিন্দ ভৌমিকের (৪৮) সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এখানে সতীদাহের একটা বেদি আছে যা মানুষ দেখতে আসেন। জমিদারের নিদর্শন বলতে ভাঙাচুড়া ভবন আছে, আর আছে স্তূপাকারে চুন সুরকিসহ খোয়া। জমিদার বংশের লোকজন নানা স্থানে চলে গেছে। আমরা শুধু দু এক ঘর আছি। জমিদারের বংশধরেরা ভারতে থাকেন। এছাড়া রায়েন্দা, মোড়েলগঞ্জ ও বাগেরহাটসহ ইত্যাদি স্থানে বসবাস করছেন।
জমিদারবাড়ির উত্তরপ্রজন্মের আরেকজন শ্যামাপ্রসাদ (৬০) সরকার বলেন, এই বাড়িটা ঈশ্বর নারায়ণ সরকারের বাড়ি। প্রতিষ্ঠাকাল ২০০ বছরের বেশি। আমি এখানকার ৬ষ্ঠ প্রজন্ম। এ বাড়ির উঠোন ঘিরে ২৪টি প্রাচীন স্থাপনা আছে। এটা একটা বিরল হেরিটেজ। এখন সবই বিলুপ্তির পথে। আমার ছোটবেলায় দেখা এ বাড়িতে ২০০ জনের ওপরে লোক ছিল। এখন আছি শুধু আমরা দুই পরিবার। ভবন দাঁড়িয়ে আছে, তবে ছাদ নেই। এসব স্থাপনা মেরামতের অর্থ ও জনবল কোনটাই এখন নেই।
ইতিহাস খ্যাত ১২ ভুঁইয়ার অন্যতম একজন রাজা প্রতাপাদিত্য দুজন যথাক্রমে সীতারাম ও বিজরাম বরিশালের এই স্থানটিতে জমিদারি শুরু করেন ১৫৬০ থেকে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। এসব স্থাপনা তখনকার নির্মিত। বরিশাল বিভাগের অন্যতম নির্মাণ শৈলীর অনন্য প্রাচীন নিদর্শন যা একেবারেই অবহেলা আর অযত্নে পড়ে আছে।
এ বিষয়ে লেখক ও গবেষক সাইফুল আহসান বুলবুল বাসসকে বলেন, আমরা এই নিদর্শনকে একটি সম্পদ মনে করি। মোগল সাম্রাজ্যের শেষের দিকে ভারতবর্ষে যে কটা স্বাধীন রাজ্য তাদের নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলো ১২ ভুঁইয়ারা। বরিশালের এই জমিদার বাড়িটি যারা প্রতিষ্ঠা করেছেন, তারা ওই ১২ ভুঁইয়াদের অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্যর বংশধর সীতারাম ও বিজরাম। এর অর্থ হলো আমরা সেই আমলের সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে রেখেছি। এখন এটা যদি আমরা কাউকে না দেখাতে বা বোঝাতে পারি তাহলে ইতিহাস থেকে আমরা অনেক দূরে সরে যাবো।
সাইফুল আহসান বুলবুল আরো বলেন, একটা জাতি গঠনে স্থানীয় ইতিহাসই সবচেয়ে বড় উপাদান। এই উপাদানগুলো একত্র করে যদি জাতীয় ইতিহাসে সম্পৃক্ত করতে না পারা যায়, তবে সেটা হবে আমাদের ব্যর্থতা। তাই আমরা চাই এই স্থাপত্য শৈলী সমৃদ্ধ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মসহ সবাইকে এ সম্পর্কে অবহিত করা হোক।
ইতিহাসকে স্বচক্ষে দেখতে তাই দুর্গম পথ পেরিয়ে প্রতিদিন এই স্থানটিতে নানা ধরনের মানুষ এসে থাকেন। তাদের মতে এ স্থানের প্রায় ১৬টি স্থাপনা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর তাই তারা অন্য ২৪টি স্থাপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রত্নতত্ত্ব ও পর্যটন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চান। এমন সব স্থাপনার সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে বানারিপাড়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোসাম্মত আফরোজা বেগম বলেন, এই ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে এই ভুখণ্ডের ইতিহাসকে নির্দেশ করে। স্থানীয় কৃষ্টি কালচারকে নির্দেশ করে। এখানকার ৪০টি স্থাপনা থেকে এখন মাত্র ২৪টা স্থাপনা শুধু দেয়াল আকারে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এর নির্মাণ কাঠামো ও শৈলী এগুলো প্রাচীন প্রত্নতত্বের নিদর্শনের একটা স্মারক। এটা একেবারেই ভিন্ন মাত্রার। এগুলো সংরক্ষণ করলে অনেক পর্যটক ও শিক্ষা পিপাসুরা আসবেন এবং এলাকাটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
বাইশারি সৈয়দ বজলুল হক কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ এনামুল হক বলেন, এই ভিটায় ৪০টা স্থাপনা ছিল, এখন ২৪টা আছে। বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে জ্ঞানপিপাসু মানুষ এখানে আসেন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখার জন্য। অন্য কোথাও একই স্থানে এতগুলো প্রাচীন নিদর্শন আছে বলে মনে হয় না। এগুলো পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা ও সংরক্ষণের জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাই।
লোকমুখে শোনার পর ইতোমধ্যেই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের লোকজন এই স্থানটি পরিদর্শন করে গেছেন। ধারণা করা হচ্ছে বাংলার ১২ ভূইয়ার ইতিহাসের অন্যতম এই অংশটিকে সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে।
এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর এর সহকারী কাস্টোডিয়ান আরিফুর রহমান বাসসকে বলেন, আমরা সম্প্রতি ওই স্থানটিতে গিয়েছিলাম। ওখানে একটি নয় বরং একাধিক আমলের প্রাচীন স্থাপনা রয়েছে। একস্থানে এতোগুলো প্রাচীন স্থাপনা বরিশাল অঞ্চলে নেই। এগুলো প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একসাথে ২৪টি প্রাচীন স্থাপনা আর কোথাও নেই। এর আগে এটি সংরক্ষণে কেউ আমাদের অবহিত করেনি। আমি জানার পর সেখানে গিয়েছি। শিগগিরই এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করবো।
উল্লেখ্য, বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলায় মোট ২৫টি পুরাকীর্তিকে সংরক্ষিত করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এর মধ্যে লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি, কড়াপুরের মিয়াবাড়ির মসজিদ ও চাখারে শের-ই বাংলার বিশ্রামাগার অন্যতম।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)