অভিমান ভেঙে ৩৮ বছর পর ফিরলেন স্বামী, আনন্দে ভাসল পরিবার
অভিমান, বিচ্ছেদ, দীর্ঘ অপেক্ষা আর ফিরে পাওয়ার এক অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হয়েছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী ক্যাম্পপাড়া গ্রাম। স্ত্রী ও ছোট্ট সন্তানকে রেখে ৩৮ বছর আগে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া জবেদ আলী (৬৬) হঠাৎ করেই ফিরে এসেছেন নিজের জন্মভিটায়। যাকে পরিবার ও স্বজনরা বহু আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিল, সেই মানুষটিকে সামনে পেয়ে কান্নায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনরা।
গত সোমবার বিকেলে গাংনী উপজেলার বামন্দী ক্যাম্পপাড়া গ্রামে এ আবেগঘন ঘটনার জন্ম হয়। স্থানীয়রা জানান, গ্রামের রাস্তায় এক বৃদ্ধকে ধীরে ধীরে হেঁটে আসতে দেখে প্রথমে কেউ তার পরিচয় বুঝতে পারেননি। বয়সের ভারে ন্যূব্জ ওই ব্যক্তি যখন নিজের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ান, তখন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনিই ৩৮ বছর আগে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া জবেদ আলী।
খবরটি মুহূর্তেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। স্বজন, প্রতিবেশী ও কৌতূহলী মানুষজন ভিড় জমান তার বাড়িতে। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে যেমন ছিল চোখের জল, তেমনি ছিল দীর্ঘ বিচ্ছেদের বেদনা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে পারিবারিক কলহ ও স্ত্রীর প্রতি অভিমান থেকে বাড়ি ছাড়েন জবেদ আলী। সে সময় তার একমাত্র ছেলে জাহাঙ্গীর আলমের বয়স ছিল মাত্র চার বছর। বাড়ি ছাড়ার পর প্রথমদিকে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করলেও তার কোনো সন্ধান পাননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা ধরে নেন, হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই।
জবেদ আলীর স্ত্রী রুশিয়া খাতুন বলেন, আমি মায়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেই সুযোগে কাউকে কিছু না বলে সে বাড়ি থেকে চলে যায়। এরপর আর কোনো খোঁজ পাইনি। এত বছর একা সংসার চালিয়েছি, সন্তানকে বড় করেছি। হঠাৎ করে সে ফিরে আসবে, এটা কখনও ভাবিনি। এখন তাকে মেনে নিতে হলে এত বছরের ভরণপোষণের হিসাব আগে দিতে হবে।
দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণ সম্পর্কে জবেদ আলী বলেন, অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। পরে অনেকবার ফিরে আসার কথা ভেবেছি। কিন্তু অর্থনৈতিক কষ্ট ও নানা পরিস্থিতির কারণে আর ফেরা হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছি। পরে মানিকগঞ্জে স্থায়ী হই। সেখানে জমি কিনে দ্বিতীয় বিয়ে করি এবং নতুন সংসার শুরু করি। দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যার বয়স বর্তমানে ১১ বছর। প্রায় আট বছর আগে দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যু হলে তিনি একাকী জীবনযাপন করতে থাকেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের জন্মভিটা ও প্রথম পরিবারের কথা বেশি মনে পড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সব দ্বিধা কাটিয়ে তিনি ফিরে আসেন গ্রামের বাড়িতে।
জবেদ আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাবার স্মৃতি আমার খুব বেশি মনে নেই। কারণ আমি যখন মাত্র চার বছরের ছিলাম, তখনই তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তবে এত বছর পর বাবাকে ফিরে পেয়ে আমি আবেগাপ্লুত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এমন ঘটনা তাদের এলাকায় আগে কখনও ঘটেনি। অনেকেই জবেদ আলীর ফিরে আসাকে জীবনের এক বিরল অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। কারও মতে, এটি ফিরে পাওয়ার আনন্দের গল্প; আবার কারও মতে, দীর্ঘ বিচ্ছেদ ও পারিবারিক সম্পর্কের মূল্যবোধের এক বাস্তব উদাহরণ।
৩৮ বছর পর হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যের ফিরে আসার এ ঘটনা এখন মেহেরপুরজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই বাস্তবের এই ঘটনাকে সিনেমার গল্পকেও হার মানানো এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করছেন।

রেজ আন উল বাসার তাপস, মেহেরপুর