সংসদে কথা বলে লাভ না হলে খোদা হাফেজ বলে চলে আসব : জামায়াত আমির
বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যেদিন সংসদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে, যেদিন মনে হবে—এই সংসদে আর কথা বলে লাভ নেই, সেদিন সেই সংসদে খোদা হাফেজ বলে আমরা বেরিয়ে আসব।
আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর বিজয় নগরে ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম-খুনের বিচারের দাবিতে আয়োজিত এক সমাবেশে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
সরকারি দলের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যাদের নিজেদের কর্মীদের সম্পর্কে নিজেদেরই কোনো দায় ও দরদ থাকে না, ২০ কোটি মানুষের জন্য তাদের কী দায় ও দরদ থাকবে। জেলায় জেলায় প্রশাসক বসিয়ে দেওয়া, এমনকি খেলার মাঠ পর্যন্ত তারা দলমুক্ত রাখতে পারলেন না। হয় আপনারা বিচার নিশ্চিত করুন, না হয় আপনারা যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করুন।
জামায়াত আমির বলেন, আপনাদের একজন সিনিয়র নেতা ঘোষণা দিয়েছেন, নির্মূল করবেন। অতীতে যারা নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা নিজেরাই আজ নির্মূল হয়ে গেছে। বাংলাদেশের দিকে কাউকে লাল চোখ দিয়ে তাকাতে দেব না, ইনশাল্লাহ। কোনো কালো হাত বাড়ালে সেই হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের যাতাকলে পৃষ্ঠ এই জাতিকে আল্লাহতায়ালা আমাদের ছাত্র-শ্রমিক, যুব-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাত্র দুটি বছর আগে আমাদেরকে মুক্তি দিয়েছিলেন। সেই সময় যে দলটি আমাদের মতোই মজলুম ছিল, নির্যাতিত ছিল, আজ তারা ক্ষমতায় আছে। তারা তখন প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছিল। নির্বাচনের সময় তারা বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে ফ্যাসিবাদের হাতে যতগুলো খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, নির্যাতন হয়েছে, সবগুলোর বিচার তারা করবে। ক্ষমতায় বসার পর এখন তাদের সুর পাল্টে গেছে। বিচার তো তারা করছেই না, বরঞ্চ আপনারা শুনেছেন—চার মাসে ৬০০ জনের অধিক মানুষ নির্ভমভাবে বাংলার মাটিতে খুন হয়েছে। আরও দুঃখজনক এ দলটি নিজেদের হাতে নিজেদের কর্মীদেরকেই খুন করেছে। যাদের নিজেদের কর্মীদের সম্পর্কে নিজেদেরই কোনো দায় ও দরদ থাকে না, ২০ কোটি মানুষের জন্য তাদের কী দায় ও দরদ থাকবে? আমরা কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না।
জামায়াত আমির বলেন, লজ্জার বিষয় ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলে ঠিক ফ্যাসিবাদের রাজপথ ধরেই তারা এখন হাঁটা শুরু করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন ব্যাংকে অযাচিত হস্তাক্ষেপ, বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজগুলো দলীয় অনুগত লোকদের দিয়ে দখল করা, জেলায় জেলায় প্রশাসক বসিয়ে দেওয়া, এমনকি খেলার মাঠ পর্যন্ত তারা দখলমুক্ত রাখতে পারলেন না। এভাবে তারা আবার কার্যত একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকেই এগোচ্ছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ বারবার বিপ্লবের সাক্ষী। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি—হয় আপনারা বিচার নিশ্চিত করুন, না হয় আপনারা যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করুন। আপনারা যে পথে হাঁটছেন, সংসদে আমরা প্রত্যেকটি বিষয় সেখানে প্রতিবাদ করছি। দুই তৃতীয়াংশ (আসন) কীভাবে পেয়েছেন, আপনারাই ভালো জানেন আর এদেশের জনগণও জানে এবং এই ব্যাপারে কিছু রাজসাক্ষীও ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। আপনাদের দলের ভেতর থেকে পাওয়া গেছে। বিগত সরকারের মধ্য থেকেও পাওয়া গেছে।
জামায়াত আমির আরও বলেন, এই রাস্তায় আমাদের কলিজার টুকরা বিপ্লবের প্রতীক শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। তার বিচার ও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ঠিক। এখন পর্যন্ত চার্জশিট দেওয়া হয়নি। কাকে খুশি করার জন্য, কোন সত্যকে আড়াল করার জন্য এটা করা হচ্ছে? জনগণ জানতে চায়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই ২১ তারিখ একমাত্র দুদিন আগে গাইবান্ধায় ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, ছাত্রশিবিরের একজন তরুণ নেতাকে গলাকটে স্পষ্ট দিবালোকে সেই ফ্যাসিবাদী কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করে মানুষকে দুনিয়া থেকে বিদায় দেওয়া যাবে, কিন্তু কোনো আদর্শকে খুন করা যাবে না। এদেশের মানুষের অন্তরে, কলিজায়-হৃদয়ে-মগজে সব জায়গায় বসে আছে মজবুতভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ। এই আদর্শকে নির্মূল করার চিন্তা করবেন না। যদিও আপনাদের একজন সিনিয়র নেতা ঘোষণা করে দিয়েছেন, নির্মূল করবেন। অতীতে যারা নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা নিজেরাই আজকে নির্মূল হয়ে গেছে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, নির্মূল নির্মূল বেশি করবেন না। এটা এক ধরনের ভাইরাস। এই ফ্যাসিবাদের ভাইরাস, চাঁদাবাজির ভাইরাস। দুর্নীতির ভাইরাস, দলীয় শাসনের ভাইরাস, এসব ভাইরাস মুক্ত করার জন্য আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সেই বিপ্লবের জন্য আপনারা কি প্রস্তুত?
জামায়াত আমির বলেন, মানুষের জীবন, ইজ্জত ও সম্পদ দেশের সীমানার জন্য আরেকবার কি জীবন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন? এই বয়সে আমি এবং আমরা পিছিয়ে থাকবো না। সম্মুখ সারিতে থাকব। আড়ালে আবঢালে নয়। তবুও বাংলাদেশের দিকে কাউকে লাল চোখ দিয়ে তাকাতে দেব না, ইনশাআল্লাহ। কোনো কালো হাত বাড়ালে সেই হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত এই দেশকে পাহারা দেবে, ইনশাআল্লাহ। কারও বাবার সাধ্য নেই, এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে টানাটানি করার। আপনাদেরকে আগামীর সেই বিপ্লবের দাওয়াত আজ দিয়ে রাখলাম। সংসদে যতদিন পর্যন্ত কথা বলার পরিবেশ থাকবে, জাতির স্বার্থে যতদিন পর্যন্ত থাকার দরকার হবে, তার বাইরে আমরা এক সেকেন্ডও থাকব না। যেদিন সংসদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে, যেদিন মনে হবে, এই সংসদে আর কথা বলে লাভ নেই, সেদিন সেই সংসদে খোদা হাফেজ বলে আমরা বেরিয়ে আসব। প্রস্তুত থাকুন সেই বিপ্লবের জন্য। অন্যায়ের সঙ্গে কোনো আপস নয়। নতুন-পুরাতন কোনো ফ্যাসিবাদ মানি না। কোনো ফ্যাসিবাদ মানব না, ইনশাআল্লাহ। জীবন একটাই, সেই জীবন যাবে আল্লাহর জন্য, সেই জীবন যাবে মানুষের জন্য।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক