১০ ফুট মাটির নিচ থেকে স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার, স্বামী গ্রেপ্তার
মৌলভীবাজারের রাজনগরে নিখোঁজের ১৮ দিন পর এক নারীর মরদেহ স্বামীর বসতবাড়ির উঠানের প্রায় ১০ ফুট মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে স্বামী আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আজ সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে স্ত্রীর মরদেহটি মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়।
নিহত জায়েদা বেগম রাজনগর উপজেলার ৩ নম্বর মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সোনাটিকি গ্রামের আব্দুল হান্নানের মেয়ে। তার স্বামী আলমগীর হোসেন করিমপুর চা বাগান এলাকার বাসিন্দা। গত ৩ জুলাই জায়েদা বেগমের বাবা আব্দুল হান্নান মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় রাজনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে রাজনগর থানার এসআই অরূপ সরকার ৫ জুলাই বিকেলে আলমগীর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি দাবি করেন, তার স্ত্রী গত ১৯ জুন সৌদি আরবে চলে গেছেন। তবে তার বক্তব্যে অসঙ্গতি ও সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া গেলে তাকে থানায় এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে ৫ জুলাই পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি জানান, গত ১৭ জুন রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তিনি তার সহযোগীসহ জায়েদা বেগমকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। একদিন পরে মরদেহ নিজ বসতবাড়ির উঠানে গর্ত করে মাটিচাপা দিয়ে রাখেন। স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তিনি মরদেহ পুঁতে রাখার স্থান দেখিয়ে দেন। ওই স্থান থেকেই মাটি খুঁড়ে মরদেহটি তোলা হয়। প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী অভিযান চালিয়ে মাটির নিচে সিসি ঢালাই ভেঙে বালির বস্তা দিয়ে চাপা দেওয়া অবস্থায় মৃতদেহটি পাওয়া যায়।
পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা, সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল খায়ের এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল শিকদারের উপস্থিতিতে রাজনগর থানা পুলিশ বাড়ির উঠানে মাটি খুঁড়ে জায়েদা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে। এরপর সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এ সময় উৎসুক জনতা ঘাতকের ফাঁসি চেয়ে স্লোগান দেয়।
লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে জানিয়ে পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, গত ৩ জুলাই ভিকটিম জায়েদা বগমের বাবার করা জিডির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ তার স্বামী আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রথমে সে বলে যে তার স্ত্রী বিদেশে চলে গেছেন। কিন্তু পুলিশের সন্দেহ হলে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে সে স্বীকার করে যে তার স্ত্রীকে সে মেরে ফেলেছে। পরে তার বাড়ির উঠানেই মরদেহ পুঁতে রেখেছে। এরপর আমরা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে নিয়ে তার দেখানো মতে মাটি খুঁড়ে মরদেহ উদ্ধার করি। এই খুনের পিছনে আসলে মোটিভ কী ছিল, কেন এই হত্যাকাণ্ড করা হয়েছে এখন পর্যন্ত আমরা জানতে পারিনি। তবে আমরা ধারণা করছি দাম্পত্য কলহ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিপুল সরকার বলেন, আমরা অভিযোগের ভিত্তিতে সরাসরি আসামিকে নিয়ে আসি। আনার পরে তাকে জিজ্ঞেস করি লাশ পুঁতে কোথায় রাখা হয়েছে। সে পুঁতে রাখা স্থানটি দেখিয়ে দেয়।’ দেখানোর পরে তাকে আমরা আবার থানায় পাঠাই। স্থানীয় লোক এবং ডোমের সহায়তায় মাটি খুঁড়ে মরদেহট উত্তোলন করা হয়। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন করা হয়েছে।
জায়েদা বেগমের বাবা আব্দুল হান্নান বলেন, মেয়ের জামাই আমার নাতিকে সঙ্গে নিয়ে আমার বাড়িতে আসে। এরপর জানায়, তার রক্তচাপ (প্রেসার) বেড়ে গেছে এবং তিনি ঘুমাতে চান। এরপর কোনো কিছু খাওয়া-দাওয়া না করেই ঘুমিয়ে পড়ে।
সকাল আনুমানিক ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠলে আমি তার কাছে জানতে চাই, ‘জায়েদা কোথায়?’ জবাবে প্রথমে বলে, ‘জায়েদা তো চলে গেছে।’ কিসের জন্য গেছে জানতে চাইলে বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বলে, ‘এখন বলব না, পরে বলব। আমার এখন প্রেসার বেড়ে গেছে।’ এর কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আমাকে বলে, ‘তোমার মেয়েকে আমি সৌদি আরব পাঠিয়ে দিয়েছি।’ তার এই কথা শুনে আমি বলি, ‘তুমি যে সৌদি আরবে পাঠালে, তাহলে তার পাসপোর্ট দেখাও।’ তখন সে জানায় যে, পুরোনো পাসপোর্টটিই নবায়ন করিয়েছে। আমি তখন তাকে বলি, ‘এত সকাল সকাল তো সৌদি আরবে যাওয়া যায় না, এতে সময়ের প্রয়োজন হয়। তাকে কোন দেশে (কোন শহরে) পাঠিয়েছ?’ কিন্তু সে এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। এভাবে পার হয়ে যাওয়া পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যেও আমার মেয়ে আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বা ফোন করেনি। এতে আমার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে আমি স্থানীয় মেম্বারের দ্বারস্থ হই এবং তাদের জানাই যে, আমার জামাতা আমার মেয়েকে সৌদি আরব পাঠিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করছে, কিন্তু আমার মেয়ে কোনো যোগাযোগ করছে না।
এরপর আমাদের মেম্বার এবং করিমপুরের স্থানীয় মেম্বার পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধানের জন্য একটি সালিশ-বিচারের তারিখ নির্ধারণ করেন। তবে অভিযুক্ত আলমগীর মেম্বারদের কাছ থেকে আরও দুই দিনের সময় চেয়ে নেয়। সমাধান না হওয়া ও মেয়েকে না পাওয়ায় ৩ জুলাই থানায় জিডি করি।

এস এম উমেদ আলী, মৌলভীবাজার