ফেনীতে বাড়ছে নদীর পানি, সতর্ক থাকার পরামর্শ পাউবোর
২০২৪ সালের আগস্টের ভয়াবহ বন্যার দুঃসহ স্মৃতি এখনো মন থেকে মুছতে পারেনি ফেনীবাসী। ঘরবাড়ি, ফসল আর সহায়-সম্বল হারানোর সেই ক্ষত এখনো দগদগে। এর মাঝেই উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল আর সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে ফেনীর প্রধান নদীগুলোর পানি আবারও দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার পর জেলাজুড়ে নতুন করে ছড়াচ্ছে তীব্র আতঙ্ক। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও নদীপাড়ের বাসিন্দারা আবারও এক অজানা আশঙ্কায় আঁতকে উঠছেন। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান জানান, মৌসুমি বায়ু বেশ সক্রিয় থাকায় বৃষ্টিপাত আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল সোমবার থেকে আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৯ জুলাই পর্যন্ত এই বৃষ্টিপাত ব্যাহতহীনভাবে অব্যাহত থাকতে পারে। এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ও সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর ফলে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ফাহাদ্দিস হোসাইন নদীর পানির বর্তমান অবস্থা জানিয়ে বলেন, মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর সর্বোচ্চ বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৫৫ মিটার। সেখানে আজ মঙ্গলবার দুপুর ১টা পর্যন্ত নদীর পানি আট দশমিক ২৮ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার বেশ নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে উজানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় সকাল থেকে নদীর পানি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তাই নদীপাড়ের বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উজান থেকে নেমে আসা পানির তীব্র চাপের কারণে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে পরশুরাম, ফুলগাজী এবং ছাগলনাইয়া উপজেলার বেড়িবাঁধগুলো নিয়ে। চব্বিশের বন্যায় ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলোর বেশ কিছু জায়গায় জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা হলেও, তীব্র পানির চাপ তা কতটুকু সহ্য করতে পারবে—তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে গভীর সংশয় রয়েছে।
ফুলগাজী উপজেলার বাসিন্দা মো. সাহেদ আতঙ্কের কথা জানিয়ে বলেন, ‘চব্বিশের বন্যার কথা মনে হলে এখনও রাতে ঘুম আসে না। ঘরের চাল পর্যন্ত পানি উঠেছিল, সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম। আবারও নদী উপচে পানি বাড়ার কথা শুনে বুকটা কাঁপছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ফেনীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যায় জেলার প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। সে সময় ছয়টি উপজেলার প্রায় ১৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন এবং প্রাণ হারান অন্তত ২৯ জন।
তবে মাঠপর্যায়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে আশ্বস্ত করেছে। ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানান, ফেনীসহ ৫ জেলায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের একটি আগাম পূর্বাভাস রয়েছে। জেলায় নিয়মিত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যদি অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল নামে তবে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।
ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, নদীর পানির উচ্চতা নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। একই সাথে সীমান্তের ওপারে বৃষ্টিপাতের অবস্থাও সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি শুকনো খাবার মজুত রাখা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো দুর্যোগ দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়।

তোফায়েল আহাম্মদ নিলয়, ফেনী