আবু সাঈদ হত্যা : চূড়ান্ত রায় পেতে আজ আপিল করবে আসামিরা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ ও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৯ এপ্রিল রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন–বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এতে দুজনের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন আদালত। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন–পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন–সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ও সাবেক এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতিভূষণ রায়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ এ মামলার মোট আসামি ৩০ জন। এরমধ্যে ২৩ আসামি পলাতক রয়েছেন।
৭ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন তারা হলেন–বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ। সবশেষ গত ১৬ মে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. হাসিবুর রশীদকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।
পলাতক আসামির মধ্যে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমান, সাবেক সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল রয়েছেন।
গত ১৪ জুন গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদসহ ৩০ আসামির সাজার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।
এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আবু সাঈদ জুলাই আন্দোলনে অন্যতম শহীদ। তিনি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৩০ আসামির মধ্যে ছয়জন গ্রেপ্তার রয়েছেন। রায়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা আপিল দায়ের করেছেন কিনা এখনো আমরা জানি না। জেলে যারা রয়েছেন তারা আপিল করলে আমরা আশা করবো আসামিদের সাজা বহাল থাকবে।’
আজিজুর রহমান দুলু এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আমি মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আমির হোসেনসহ চারজনের পক্ষে আজ (১৬ জুলাই) ট্রাইব্যুনালের সাজার বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করবো। গত ২১ জুন আমরা পূর্নাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পেয়েছি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের অভিযোগ সঠিকভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং ট্রাইব্যুনালের রায়ে ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়েছে। আশা করি আপিল বিভাগে আসামিপক্ষ ন্যায়বিচার পাবেন।’
রায়ে এক নজরে কে কী সাজা পেলেন
রায়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনজনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তারা হলেন- সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায় ওরফে মাধব। এ ছাড়া ২৪ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত সাতজন হলেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
অন্যদিকে সাতজনের পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে। তারা হলেন- আরপিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, ছাত্রলীগের রংপুর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন।
তিন বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- বেরোবির সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল।
এছাড়া এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু ও সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়ার দুবছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনের জেরা সম্পন্ন হয়েছে। এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। ৩০ আসামির মধ্যে বর্তমানে ৬ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন—এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগনেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ।
অন্যদিকে বেরোবির তৎকালীন উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ বাকি ২৪ আসামি এখনও পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত চারজন আইনজীবী আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। এর আগে ৬ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে। তদন্ত সংস্থা ২৪ জুন চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় এবং ৩০ জুন আদালত তা আমলে নেয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক